1. abdullah53024@gmail.com : Md Abdullah : Md Abdullah
  2. admin@sotterdorpon24.com : admin : Sotter Dorpon
  3. sotterdorpon24@gmail.com : Sazzad SD : Sazzad SD
শিশুতোষ উপন্যাস রাজু ও কাঠবিড়ালী - দৈনিক সত্যের দর্পণ শিশুতোষ উপন্যাস রাজু ও কাঠবিড়ালী - দৈনিক সত্যের দর্পণ
বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১০:৪৬ পূর্বাহ্ন
বিজ্ঞপ্তি :
বাংলাদেশের জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল দৈনিক সত্যোর দর্পণ পত্রিকার পক্ষ থেকে দেশ বাসিকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন সত্য প্রকাশে অবিচল” এই স্লোগানকে বুকে ধারন করে আমাদের পথ চলা, আপনার আশে-পাশে ঘটে যাওয়া ঘটনা খবরের পিছনের খবর সবার আগে দেশ-বাসিকে জানাতে আমাদের ই-মেইল করুন, আমরা তার সতত্য যাচাই করে প্রকাশ করব। যোগাযোগঃ মোবাইল: +৮৮ ০১৭৫৫-৪১৬২৬২ ই-মেইল: sotterdorpon24@gmail.com

শিশুতোষ উপন্যাস রাজু ও কাঠবিড়ালী

সত্যের দর্পণ ডেস্ক
  • Update Time : সোমবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৫
  • ৫৬৯ Time View
শিশুতোষ উপন্যাস রাজু ও কাঠবিড়ালী

শিশুতোষ উপন্যাস

রাজু ও কাঠবিড়ালী

ফাহিম শাহরিয়ার রুমি

১. রাজু ছিল গ্রামের এক ছোট ছেলে। তার বয়স ছিল প্রায় আট বছর। ছোট্ট শহরের পাশেই ছিল বড় একটা বন, যেখানে বিভিন্ন প্রাণী বাস করত। রাজু প্রতিদিন স্কুল শেষে সেই বনে যেতে ভালোবাসত। বনের মাঝখানে ছোট ছোট গাছ, ঘাস আর ফুলের সাঁতার, পাখির গলা, আর দূরে দূরে খরগোশ ও কাঠবিড়ালির চলাচল তার মনে আনন্দ এনে দিত। সে ছিল খুবই উৎসাহী আর কৌতূহলী।

রাজু ছিল খুবই বন্ধুসুলভ এবং স্বভাবসুন্দর। তার ছোট্ট হাতে ছিল একটা ছোট লাঠি, যা দিয়ে সে গাছের শাখা হালকা করে সরিয়ে পথ তৈরি করত। সে খুবই সাহসী ছিল, কিন্তু কখনো বন্য প্রাণীদের কাছ থেকে ভয় পেত না। রাজুর বাবা-মা তাকে সবসময় বলত, “সাবধান থেকো, বনের প্রাণীদের সাথে ভালো ব্যবহার করো।”

একদিন বিকেলে স্কুল থেকে ফেরার পর রাজু তার ব্যাগ রেখে বনের দিকে চলে গেল। গরম রোদ থেকে বাঁচতে সে একটা বড় শাঁখা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিল। হঠাৎ তার চোখ পড়ল গাছের শাখায় এক ঝকঝকে কাঠবিড়ালির ওপর। কাঠবিড়ালিটা ছোট, গায়ে লালচে বাদামী, চোখ বড় বড় আর খুব চঞ্চল।

রাজু খুব যত্ন করে ধীরে ধীরে কাঠবিড়ালিটির কাছে গেল। কাঠবিড়ালি দেখতে পেলেও পালাতে চায়নি। বরং একটু কুঁড়ল করল আর রাজুর হাতের ওপর উঠে এল।

“তুমি কে? এত সাহসী?” রাজু বলল। কাঠবিড়ালি তার ছোট ছোট দাঁত দেখিয়ে যেন হাসল। রাজু ভাবল, “এই যে, তোর নাম কি হবে?” কিছুক্ষণ ভাবার পর বলল, “তোর নাম হবে কাঠু!” কাঠবিড়ালি লাফ দিয়ে রাজুর কাঁধে চড়ে বসল।

রাজু খুব খুশি হল। সে ভাবল, ‘আমার বনের মধ্যে একটা বন্ধু হবে, যার সাথে আমি ঘুরতে পারব।’

রাজু ও কাঠু একসাথে বনে ঢুকল। বনের ভিতর হাঁটার সময় তারা নানা ধরনের গাছ, ফুল আর ছোট ছোট প্রাণী দেখল। পাখিরা গান গাইছিল, আর গাছের পাতা হাওয়ায় দুলছিল। কাঠু লাফিয়ে লাফিয়ে রাজুর পেছনে পেছনে আসছিল।

হঠাৎ তারা এক ছোট্ট খরগোশকে দেখল, যে বনের মাটি খুঁড়ে কিছু খুঁজছিল। রাজু বলে উঠল, “খরগোশ ভাইয়া, তুমি কি খুঁজছ?” খরগোশ বলল, “আমি আমার খাবার খুঁজছি, কিন্তু আজ খাবার খুব কম!” রাজু কাঠুর সাথে মাথা ঘুরিয়ে দেখল বনের অনেক গাছ থেকে ফল পড়েনি, কারণ গরম বেশি ছিল। রাজু ভাবল, ‘আমাদের কিছু একটা করতে হবে।’

রাজু বলল, “কাঠু, আমরা কি একটা জায়গায় গিয়ে ফল জোগাড় করব? তারপর খরগোশের কাছে নিয়ে যাব।” কাঠু লেজ দুলিয়ে রাজুকে সম্মতি জানালো। তারা নেমে পড়ল বনের অন্য দিকে, যেখানে বড় বড় আম গাছ আর আনারস গাছ ছিল।

রাজু লাঠি দিয়ে আম আর আনারস ঝাড়ল, আর কাঠু লাফ দিয়ে গাছ থেকে ছোট ছোট ফল সংগ্রহ করছিল। কিছু সময় পর তাদের ব্যাগ ভর্তি ফল হয়ে গেল। তারা আনন্দে খরগোশের কাছে গেল।

খরগোশ ফলগুলো দেখে খুব খুশি হল। সে বলল, “তোমরা সত্যিই খুব ভাল বন্ধুত্বের নিদর্শন!” এরপর খরগোশ রাজুকে বলল, “আমরা সবাই মিলে বনের পরিচর্যা করলে বন সুন্দর থাকবে।”

রাজু ও কাঠু একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসল। তারা বুঝল, তারা শুধু বন্ধু নয়, বনের রক্ষকও হবে।

বাড়ির দিকে ফেরার সময় রাজু কাঠুকে বলল, “আমাদের আরও অনেক কিছু শেখা আর করা বাকি আছে। তুমি আমার সঙ্গী, আমরা সবকিছু মিলে খুব সুন্দর জীবন গড়ে তুলবো।” কাঠু রাজুর কাঁধে আরেকবার লাফ দিল। তারা দুজনে মিলে বাড়ির পথ ধরল।

বাড়ি পৌঁছে রাজু তার মাকে সবকথা বলল। মা বলল, “তুমি বনের প্রতি ভালোবাসা রাখো, সেটা খুব ভালো কথা। সবসময় সতর্ক থেকো, আর তোমার কাঠুবিড়ালির বন্ধুকে ভালো রাখো।” রাজু খুশি খুশি হাসল।

সেদিন থেকে রাজু আর কাঠু একটি দম্পতি হয়ে গেল বন-বাড়ির ছোট্ট অভিযানে।

 

২. একদিন বিকেলে, রাজু আর কাঠু বনে হাঁটছিল। গাছগুলোর ছায়া জমে পড়ছিল মাটিতে। পাখিরা বিভিন্ন সুরে গান গাইছিল আর বাতাসে ফুলের মিষ্টি গন্ধ ভাসছিল। রাজুর মন ছিল আনন্দে ভরপুর। কাঠু তার ছোট ছোট পা দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়াচ্ছিল।

“আজ আমরা একটা বড় কাজ করব কাঠু,” রাজু বলল। “আমাদের বনের বন্ধুদের সাহায্য করতে হবে।”

কাঠু লেজ দুলিয়ে রাজুর কথা বুঝতে চাইছিল।

বনের ভিতর রাজু আর কাঠু নানা প্রাণীর সঙ্গে মিশছিল। তারা দেখল ছোট ছোট পাখির একটি দল, যারা নতুন ঘর বানাচ্ছিল। গাছের ডালে তারা পাখির ছোট্ট বাসা গড়ছিল। কাঠু পাখিদের কাছে গিয়ে তাদের নিয়ে খেলল, আর রাজু তাদের সাহায্য করল।

এরপর তারা দেখল একদল ছোট খরগোশ গর্তে লুকিয়ে আছে। রাজু জানতে পারল, বনে একদল শেয়াল এসেছে, যার জন্য প্রাণীরা আতঙ্কিত।

“আমাদের কি কিছু করা উচিত?” রাজু ভাবল।

আসলে, বনের বাইরে থেকে কয়েক জন লোক ঢুকেছিল। তারা গাছ কাটা শুরু করেছে বনের জন্য। রাজু আর কাঠু লক্ষ্য করল, গাছ কাটার শব্দে বনের অনেক প্রাণী দৌড়াচ্ছে ভয় পেয়ে।

রাজু বলল, “আমাদের বনের গাছ রক্ষা করতে হবে। এটা আমাদের বন্ধুরা বাস করে এখানে।”

রাজু আর কাঠু বন থেকে দ্রুত গ্রামে গেল। রাজু বাড়িতে গিয়ে তার বাবা-মাকে সব কিছু জানাল। বাবা বলল, “আমরা সবাই মিলে যদি একসাথে কাজ করি, তাহলে বনের রক্ষা করতে পারব।”

রাজু গ্রামের কিছু বন্ধুদের সঙ্গে মিটিং করল। সবাই রাজুর কথা শুনে বনের জন্য সাহায্য করতে রাজি হল।

পরদিন সকালের আলো উঠতেই, রাজু, কাঠু আর গ্রামের শিশুরা বনের দিকে রওনা দিল। তারা বনে গিয়ে গাছ কাটা বন্ধ করার জন্য তাদের বুদ্ধি ও সাহস ব্যবহার করল।

রাজু বলল, “আমরা গাছ কাটা বন্ধ করতে চাই। এই বনের গাছ আমাদের বন্ধুর বাড়ি।”

শিশুরা বড় চিৎকার করে বলল, “বনের গাছ বাঁচাও! বনের প্রাণী বাঁচাও!”

লোকজন বাধা পেয়ে বনের বাইরে চলে গেল। বনের প্রাণীরা আবার শান্তি পেল। ছোট খরগোশ, পাখি আর কাঠবিড়ালি সবাই রাজুকে ধন্যবাদ দিল।

“তুমি সত্যিই বনের ভালো বন্ধু,” খরগোশ বলল।

“আর তুমি, কাঠু, খুব সাহসী,” পাখিরা কন্ঠ মিলিয়ে বলল।

রাজু হেসে বলল, “আমাদের সবাইকে মিলে বনের বন্ধু হতে হবে। তখনই বনের সব প্রাণী সুখে থাকবে।”

দিন শেষে রাজু আর কাঠু বসে বনের কিনারে। সূর্য অস্ত যাচ্ছিল, আর আকাশ লাল-কমলা রঙে রাঙাচ্ছিল। রাজু ভাবল, “আমি ও কাঠু আজ বনের জন্য একটা বড় কাজ করলাম। আমাদের বন্ধুত্ব আর বেশি শক্তিশালী হয়েছে।”

রাজু বাড়ি ফিরে তার মাকে সব কিছু বলল। মা বলল, “তোমার এই ভালো কাজ তোমার মনকে বড় করবে। সবসময় বনের প্রতি ভালোবাসা রাখো, আর বনের প্রাণীদের সাহায্য করো।”

রাজু আর কাঠু তখন জানত, তাদের মজা আর কাজ এখনও শেষ হয়নি। সামনে অনেক অভিযান অপেক্ষা করছে, যেখানে তারা একসাথে নতুন নতুন বন্ধুত্ব করবে, নতুন নতুন শিক্ষা পাবে।

 

৩. এক সুন্দর সকালে রাজু ঘুম থেকে উঠে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। সূর্য আলোর ঝলকানি ছড়িয়ে দিচ্ছিল চারপাশে। পাখিরা গান গাইছিল আর বাতাসে গাছের পাতার মৃদু শব্দ শুনতে পাচ্ছিল। রাজুর মন ছিল আজকের জন্য খুবই উদ্দীপিত।

“আজ বনের মধ্যে নতুন কিছু খুঁজে পেতে পারি,” সে ভাবল।

কাঠু তার ছোট্ট লেজ দুলিয়ে রাজুর দিকে তাকালো যেন বলছে, “চলো, আজ আবার অভিযান করি।”

রাজু আর কাঠু বনে ঢুকল। তারা চলল আগের মতোই উৎসাহ নিয়ে। গাছপালা থেকে নেচে ওঠা পাখিদের কাকলি, মাটিতে হেঁটে বেড়ানো ছোট্ট প্রাণীদের চলাচল, সবকিছু যেন জীবন্ত গল্প বলছিল।

হঠাৎ, তারা এক অদ্ভুত আওয়াজ শুনল—একধরনের কাঁদার মতো শব্দ। রাজু ও কাঠু সতর্ক হয়ে শব্দের উৎস খুঁজতে শুরু করল।

“সেখানে,” কাঠু লাফ দিয়ে একটা বড় গাছের পেছনে গেল।

রাজু গিয়ে দেখল, একটা ছোট্ট বানর গাছের নিচে একা পড়ে কাঁদছে। তার ছোট পা দুটো জড়িয়ে ধরে, আর চোখ থেকে জল ঝরছে। রাজু জিজ্ঞাসা করল, “তুমি কি পারবে বলো, তোমার কী হয়েছে?”

বানরটি নাম হল মিমু। সে বলল, “আমি বনের অন্য বানরদের থেকে হারিয়ে গেছি। আর এখন আমি কোথায় যাব জানি না। আমার মা-ও খুঁজছে আমাকে।”

রাজু মিমুকে শান্ত করল, “ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমরা তোমাকে তোমার মায়ের কাছে ফেরত দেব। তুমি আমার আর কাঠুর বন্ধু হতে পারো।”

মিমুর চোখে অশ্রু ঝলসে উঠল। সে ধীরে ধীরে রাজুর কাঁধে উঠল আর কাঠুর সঙ্গে মিশে গেল।

তারা তিনজন মিলে বনে হাঁটতে শুরু করল মিমুর মা খুঁজতে। পথে নানা প্রানীর সঙ্গে কথা বলল, আর বনের রাস্তায় খোঁজ নিল। রাজু বলল, “আমাদের সবাইকে মিলে মিমুর মা খুঁজে বের করতে হবে।”

হাঁটতে হাঁটতে তারা দেখতে পেল বনের এক জায়গায় গাছ কাটা হচ্ছিল। সেই জায়গায় অনেক পাখি আর ছোট প্রাণী দের উদ্বিগ্ন করে ছুটে বেড়াচ্ছিল। রাজু ভাবল, “আমাদের আবার বনের রক্ষা করতে হবে।”

তারা সেই জায়গায় গিয়ে গাছ কাটার যন্ত্রগুলো বন্ধ করার জন্য চেষ্টা করল। কাঠু, রাজু আর মিমু মিলে বনের শান্তি ফেরানোর জন্য একসাথে কাজ করল।

রাজু বলল, “আমরা বনের শান্তি ফিরিয়ে আনব, আর মিমুকে তার মায়ের কাছে নিয়ে যাব।”

তারা তিনজন মিলে বনের গভীরে আরও গভীর তদন্ত শুরু করল।

মিমু শেখল, “সত্যি বন্ধু মানেই কঠিন সময়ে পাশে থাকা। রাজু আর কাঠু আমার বন্ধু হয়ে গেল।”

রাজু বলল, “আমাদের একসাথে অনেক কিছু করা বাকি আছে।”

সন্ধ্যার আলো পড়তেই তারা বনের বাইরে এসে বসে পড়ল। রাজু ভাবল, “আজকের দিনটা ছিল অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আমরা মিমুকে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেব। আর বনের রক্ষা করব।”

মিমু বলল, “বন্ধুত্ব মানেই একে অপরকে সাহায্য করা, একসাথে সাহস হারানো নয়।” রাজু ও কাঠু মিলে হাসল। তারা জানত, নতুন নতুন অভিযান আর শিক্ষার জন্য তাদের বন্ধুত্ব আরও শক্তিশালী হবে।

 

৪. এক নতুন দিনের আলো ফোটার আগে রাজু তার ঘরের জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। আকাশে মৃদু গোলাপী রঙ ছড়িয়ে পড়েছিল। পাখিরা গাইছিল তাদের সুরেলা গান। রাজুর মনে উদ্দীপনা ভরে উঠল। আজকের দিনটি বিশেষ হওয়ার আগ্রহ তাকে শুরুর দিকে টেনে নিয়ে গেল।

কাঠু, রাজুর সঙ্গী, তার ছোট্ট লেজ ঝলমল করে রাজুর পা ছুঁয়ে দিল। যেন বলছে, “চলো, আজ আমরা বনের সেই রহস্যময় জলাশয় খুঁজে বের করি।”

রাজু আর কাঠু বনের মধ্যে ঢুকল। বনের গাছগুলি শীতল ছায়া দিচ্ছিল আর বাতাসে লতা-পাতার হালকা শব্দ ভাসছিল। তারা হাঁটতে হাঁটতে একটা পুরনো পথ পেয়েছিল, যা আগে কখনও তারা অনুসরণ করত না।

“এ পথটা আমরা আগে কখনো পাইনি, কাঠু,” রাজু বলল। কাঠু লেজ দুলিয়ে উত্তর দিল, “হয়তো আজ আমাদের নতুন কিছু খুঁজে পাবে।”

তাদের পথ চলতে চলতে দূর থেকে পানির ধ্বনি শোনা গেল। ধীরে ধীরে তারা পৌঁছালো এক গোপন জলাশয়ের কাছে। জলাশয়টি ছিল ছোটো কিন্তু পরিষ্কার, চারপাশে নানা রকমের ফুল আর গাছ লাগানো ছিল।

জলাশয়ের কাছ থেকে আসা স্রোতস্বন থেকে বনে নতুন প্রাণের গন্ধ ভেসে আসছিল।

রাজু এবং কাঠু দেখতে পেল জলাশয়ের ধারে ছোট ছোট মাছ কাঁদছে, আর পাখিরা তার গাছের ডালে বসে বিশ্রাম নিচ্ছে। হঠাৎ একটি শব্দ এল, “কী হল? আমাদের জলাশয় কোথায় যাচ্ছে?”

রাজু ও কাঠু অবাক হয়ে চারপাশ তাকিয়ে দেখল, জলাশয়ের পানি কমতে শুরু করেছে।

“আমাদের কিছু করা দরকার,” রাজু বলল। “আমাদের বনের এই জলাশয় রক্ষা করতে হবে।”

রাজু ভাবল, “জলাশয় কমার কারণ খুঁজে বের করতে হবে।” তারা জলাশয়ের চারপাশ ঘুরে দেখল। কিছু দূরে একদল লোক গাছ কাটছে এবং তাদের কাজের ফলে মাটির কিছু অংশ ধসে জলাশয়ে পানি কমছে।

“আমাদের এই লোকদের বুঝিয়ে দিতে হবে যে, তারা বন এবং জলাশয় ধ্বংস করছে,” রাজু বলল।

রাজু আর কাঠু দ্রুত গ্রামে ফিরল। রাজুর বাবা-মাকে বিষয়টা জানাল। বাবা বলল, “আমরা সবাই মিলে যদি কাজ করি, তাহলে বনের এই জলাশয় বাঁচাতে পারব।”

রাজু গ্রামের বাচ্চাদের নিয়ে একটি সভা করল। সবাই রাজুর কথা শুনে বনের জন্য সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নিল।

পরদিন সকালের আলোতে রাজু, কাঠু এবং গ্রামের বাচ্চারা বনের দিকে রওনা দিল। তারা গাছ কাটার যন্ত্র বন্ধ করতে কাজ করল এবং লোকেদের বুঝিয়ে দিল বনের পরিবেশ রক্ষা করার গুরুত্ব।

শিশুরা বনের চারপাশে গাছ লাগাল এবং মাটি ধরে রাখার ব্যবস্থা করল। ধীরে ধীরে জলাশয়ের পানি আবার পূর্ণ হতে লাগল। জলাশয়ের চারপাশে প্রাণীরা ফিরে এলো।

রাজু বলল, “আমরা মিলে বনের এই জলাশয়কে বাঁচিয়েছি।”

কাঠু লেজ দুলিয়ে রাজুকে আনন্দ দিল। বনের ছোট প্রাণীরা সবাই তাদের কাছে ধন্যবাদ জানাল।

রাজু বলল, “প্রকৃতি আমাদের বন্ধু, আমাদের তাকে রক্ষা করতে হবে।”

তারা তিনজন বনের মধ্যে বসে সূর্যাস্তের আলো দেখল, নতুন দিনের জন্য প্রস্তুত হল।

 

৫. একদিন সকালে রাজু আর কাঠু আবার বনে ঘুরতে গেল। বাতাস ছিল ঠান্ডা আর মৃদু, আর গাছপালা থেকে শিশির ঝরছিল। পাখিরা সুরেলা গানে ভোর শুরু করল। রাজু আর কাঠু মিলে বনের ভেতর হাঁটছিল, নতুন নতুন খোঁজ নিচ্ছিল।

“আজ আমাদের একটা বিশেষ দিন হতে পারে,” রাজু বলল। কাঠু লেজ দোলাতে দোলাতে রাজুর কথায় একমত হল।

হাঁটতে হাঁটতে তারা একটি অজানা শব্দ শুনল — যেন কারো কাঁদার আওয়াজ। রাজু আর কাঠু দ্রুত শব্দের দিকে গেল। গাছের পেছনে তারা দেখতে পেল এক ছোট্ট পাখি, যার পা ভেঙে গিয়েছে।

“তুমি কী এমন করেছো?” রাজু স্নেহভরে জিজ্ঞাসা করল। পাখিটি হালকা কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমি ওড়ার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু পা ভেঙে গেছে। আমি নিজে বনের বাইরে যেতে পারছি না।”

রাজু আর কাঠু পাখিটিকে সান্ত্বনা দিল। রাজু বলল, “আমরা তোমাকে সাহায্য করব। আমাদের বনে তুমি নিরাপদে থাকো।” কাঠু পাখির পাশে বসে ছিল যেন ওকে সাহস দিচ্ছে।

রাজু তার ঝুলিতে ছোট্ট পাখিটিকে নিয়ে গেল বাড়ির দিকে, সেখানে তার মা আর বাবা তাকে ওষুধ দিল এবং আরাম করাল।

পাখিটির নাম রাখা হলো “টিঁটি”। টিঁটি ধীরে ধীরে আরাম পেতে লাগল। রাজু টিঁটির যত্ন করছিল, আর কাঠু সব সময় পাশে ছিল। রাজু ভাবল, “আমরা একটা নতুন বন্ধু পেয়েছি।”

দিন যায় আর টিঁটি ওড়ার জন্য চেষ্টা করতে থাকে। রাজু তার জন্য ছোট ছোট খেলনা বানায়, আর কাঠু ওকে উৎসাহ দেয়। একদিন টিঁটি ধীরে ধীরে ছোট দূরত্বে উড়তে শুরু করল।

“দেখো, কাঠু, টিঁটি এখন উড়তে পারছে!” রাজু আনন্দে চিৎকার করল। কাঠু লেজ দুলিয়ে হাসল।

টিঁটি বনের সাথে আরো মিশে যেতে শুরু করল। বনের প্রাণীরা টিঁটির জন্য খুশি ছিল। তারা সবাই মিলেই বনের পরিবেশ রক্ষা করত, নতুন নতুন বন্ধু তৈরি করত।

একদিন রাজু আর কাঠু বনের প্রাণীদের নিয়ে একটি উৎসব করল। সবাই মিলে গাছের নিচে গান গাইল, নাচ করল আর মজা করল। রাজু বলল, “বন আমাদের বন্ধু, আমাদের একসাথে থাকতে হবে।”

দিন শেষে রাজু, কাঠু আর টিঁটি বসে চাঁদের আলো দেখল। রাজু বলল, “আমাদের বনের বন্ধুদের জন্য যত্ন নিতে হবে, তখনই বন সুন্দর থাকবে।” তারা তিনজন হাসল, তাদের বন্ধুত্ব আরও মজবুত হলো।

৬. এক সকালে রাজু তার ছোট্ট কাঠু কে নিয়ে বনে গেল। তারা হাসিমুখে হাঁটছিল আর নতুন কিছু খোঁজার জন্য খুবই উৎসাহী ছিল।

“আজ আমরা বনের কোনো গুপ্ত ধন খুঁজে পাবো,” রাজু বলল।

কাঠু লেজ দুলিয়ে রাজুর কথায় একমত হলো। বনের পাখিরা গান গাইছিল, আর মাটিতে ছোট ছোট পাখির ডিম ভেঙে ফেলা প্রাণীর খোঁজ মিলছিল।

রাজু হঠাৎ তার পুরনো বাক্স থেকে একটি খোদাই করা মানচিত্র বের করল।

“দেখো, এটা বনের একটা পুরনো মানচিত্র। এতে দেখাচ্ছে কোথাও একটা গুপ্ত ধনের চিহ্ন আছে।” রাজু উত্তেজনায় বলল।

কাঠু লেজ ঝলমল করে বলল, “চলো, আমরা সেটা খুঁজে বের করি!”

তারা মানচিত্র নিয়ে বনের গভীরে প্রবেশ করল। গাছপালা ঘন, আর পথটা সোজা না, তাই একটু সাবধান হতে হলো।

“সাবধানে চলবে, কাঠু,” রাজু বলল।

“আমার চোখ চারদিকে,” কাঠু উত্তরে বলল।

পথ চলতে চলতে তারা অনেক অদ্ভুত চিহ্ন দেখল—বনের গাছের ওপর খোদাই করা ছোট ছোট চিহ্ন, পাথরের ওপর আঁকা রং। রাজু বলল, “এই চিহ্নগুলো হয়তো আমাদের ধনের কাছাকাছি নিয়ে যাবে।”

হঠাৎ তারা দেখল, এক ছোট্ট খরগোশ ফাঁদে আটকে আছে। রাজু আর কাঠু তার সাহায্য করল। খরগোশ বলল, “আমি তোমাদের ধনের খোঁজে সাহায্য করব।”

এরপর তারা বনের অন্যান্য প্রাণীদের কাছে গেল, যারা তাদের পথ দেখাল।

মানচিত্রের ইঙ্গিত অনুসারে তারা এক ঝর্ণার কাছে পৌঁছাল। ঝর্ণাটি ছিল খুবই সুন্দর, জল ঝরছিল গাছের ডালে আর চারপাশে রং-বেরঙের ফুল।

“এখানেই হয়তো ধন আছে,” রাজু বলল। তারা ঝর্ণার আশপাশ খুঁঁজতে লাগল।

ঝর্ণার পেছনে একটি ছোট গর্ত দেখতে পেল রাজু। গর্তের ভিতরে কিছু ঝকঝকে কিছু বস্তু দেখতে পেল। তারা আস্তে আস্তে ভিতরে ঢুকল।

তাদের সামনে ছিল একটি পুরনো বাক্স, যার ভিতরে ছিল ছোট ছোট রত্ন আর কয়েকটি পুরনো কয়েন।

“এই তো ধন!” রাজু উচ্ছ্বাসে চিৎকার করল। কাঠু লেজ দুলিয়ে হাসল।

রাজু বলল, “আমরা এই ধন বনের সকল প্রাণীদের জন্য রাখব, যেন সবাই একসাথে বনের বন্ধু হয়।”

তারা ধন বনের প্রাণীদের মাঝে ভাগ করে দিল। সবাই খুশি হল।

রাতের বেলা রাজু, কাঠু আর বনের প্রাণীরা বসে গল্প করল, গান গাইল আর তাদের বন্ধুত্বের শক্তি উপলব্ধি করল।

 

৭. এক সুন্দর সকাল। বনের পাখিরা গান করছে আর গাছপালা হাসছে সূর্যের আলোয়। রাজু আর কাঠু আজ একটা বিশেষ কাজের জন্য খুবই ব্যস্ত ছিল। তারা বনের সব প্রাণীকে নিয়ে একটি বড় উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

“আজ আমাদের বনের বন্ধুদের জন্য একটা বড় উৎসব হবে,” রাজু বলল, চোখে আনন্দের ঝিলিক।

“সবাই মজা করবে আর একসাথে মিলেমিশে থাকবে,” কাঠু উত্তেজিত হয়ে বলল।

রাজু আর কাঠু সবাইকে দাওয়াত পাঠাতে শুরু করল। পাখিরা, খরগোশ, হরিণ, বাঘ, হাতি সবাইকে আমন্ত্রণ জানানো হলো। সবাই উৎসাহ নিয়ে প্রস্তুতি নিতে শুরু করল।

“আমাদের বনের বন্ধুরা সবাই একসাথে হবে, এটা খুব আনন্দের,” রাজু বলল।

রাজু আর কাঠু বনের মধ্যে বিভিন্ন ফুল, পাতা, আর রঙিন দড়ি দিয়ে সাজসজ্জা করল। বনের প্রাণীরা ফল, বাদাম আর মধু এনে সাজালো খাবারের টেবিল।

“দেখো, সবাই মিলে একসাথে কাজ করল,” কাঠু খুশি হয়ে বলল।

সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে সবাই একসাথে বসে গল্প করল। তারা বনের গল্প শোনাল, গান গাইল আর মজা করল।

রাজু বলল, “আমাদের বন্ধুত্বের গল্প যেন বনের সব প্রাণীর কাছে পৌঁছায়।”

পরদিন সকালে সবার আগমন হলো। পাখিরা গান করল, বাঘ আর হাতি নাচল, আর খরগোশরা খেলা করল। সবাই মিলে একসাথে আনন্দ করল।

“বন আমাদের বন্ধু, আমাদের ভালোবাসা,” রাজু বলল।

সবাই মিলে খেলাধুলা করল, গল্প করল, আর নতুন নতুন বন্ধুত্ব গড়ল। কাঠু রাজুর পাশে বসে বলল, “আমি এই দিনটি কখনো ভুলব না।”

রাজু বলল, “বন্ধুত্ব আর সম্মানের মাধ্যমেই আমরা বনের শান্তি বজায় রাখব।”

সবাই সম্মত হল, আর উৎসব শেষ হলো আনন্দ আর হাসিতে।

রাতের অন্ধকারে রাজু আর কাঠু বসে আকাশের তারা দেখল। তারা ভাবল, “আমাদের বন যেন সব সময় এভাবেই ভালো থাকে।”

 

৮. একদিন সকালে রাজু আর কাঠু নতুন কিছু খোঁজার জন্য বেরিয়ে পড়ল। বনের গাছপালা ঘন, আর পাখির কুজনায় ভরপুর চারপাশ। রাজু বলল, “আজ আমরা বনের গভীরে গিয়ে কিছু রহস্য উন্মোচন করব।”

কাঠু লেজ দুলিয়ে রাজুর সাথে সঙ্গ দিল। তারা মাটির ছোট ছোট গন্ধ নিয়ে আগ্রহী ছিল।

হাঁটতে হাঁটতে তারা একটা সঙ্কীর্ণ পথ পেলো, যেখানে আগে কখনো যাইনি। চারপাশে ঝোপঝাড়, লতাপাতা সব মিলে যেন এক বর্ণিল চাদর গেড়ে দিয়েছিল।

“চলো, এই পথে যাই,” রাজু বলল, “এটা নতুন একটা রহস্য হতে পারে।”

পথের শেষে তারা একটি গুহার মুখ পেল। গুহাটির প্রবেশদ্বারটা ছিল বড় বড় পাথর দিয়ে ঢাকা, আর চারপাশে সাদা সাদা শৈবাল লেগে ছিল।

“দেখো, এখানে কেউ আগে এসেছে বলে মনে হচ্ছে,” রাজু বলল।

গুহার ভিতরে ঢুকতেই চারদিকে অন্ধকার, কিন্তু রাজুর হাতে ছিল একটি ছোট টর্চ। টর্চের আলোয় গুহার দেয়ালে আঁকা প্রাচীন ছবি দেখতে পেল তারা—বনের প্রাণীদের গল্প যেন ফুটে উঠছে।

“এই ছবি গুলো আমাদের অনেক পুরনো ইতিহাস বলছে,” কাঠু বলল, মুগ্ধ হয়ে।

তারা ধীরে ধীরে গুহার ভেতর ঢুকল। গুহার ভিতর থেকে হালকা ঠান্ডা বাতাস বয়ে আসছিল আর জল ফোঁটাছিল মাটিতে।

একটু আগলে হাঁটতে হাঁটতে তারা গুহার শেষ প্রান্তে পৌঁছাল। সেখানে এক প্রাচীন পাথরের টেবিল ছিল, যার উপর কিছু অদ্ভুত নকশা আঁকা ছিল।

রাজু টেবিলের উপর থেকে কিছু পুরনো রূপকথার বই পেলো। বইগুলোতে বনের বর্ণনা ও প্রাচীন রক্ষা করার নিয়ম লেখা ছিল।

“এই বইগুলো আমাদের বনের রক্ষাকর্তাদের উপদেশ দেয়,” রাজু বলল।

তারা বুঝল যে এই গুহাটা বনের প্রাচীন রক্ষকদের জন্য একটি পবিত্র স্থান। রাজু বলল, “আমাদের এই স্থানকে সম্মান করতে হবে, আর বনের সুরক্ষার শপথ নিতে হবে।”

বাইরে এসে সূর্য ডোবে চলেছে। রাজু আর কাঠু বুঝল, এই গুহা তাদের জন্য অনেক বড় শিক্ষা নিয়ে এসেছে।

রাজু বলল, “আমরা বনের বন্ধু এবং রক্ষাকর্তা হবো, বনকে ভালোবাসব, আর তার প্রতি সম্মান দেখাব।”

তারা হাত মিলিয়ে শপথ নিল, এবং সুখে ফিরে গেল গ্রামের পথে।

 

৯. এক সুন্দর সকাল। বনের পাখিরা গান করছে আর গাছপালা হাসছে সূর্যের আলোয়। রাজু আর কাঠু আজ একটা বিশেষ কাজের জন্য খুবই ব্যস্ত ছিল। তারা বনের সব প্রাণীকে নিয়ে একটি বড় উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

“আজ আমাদের বনের বন্ধুদের জন্য একটা বড় উৎসব হবে,” রাজু বলল, চোখে আনন্দের ঝিলিক।

“সবাই মজা করবে আর একসাথে মিলেমিশে থাকবে,” কাঠু উত্তেজিত হয়ে বলল।

রাজু আর কাঠু সবাইকে দাওয়াত পাঠাতে শুরু করল। পাখিরা, খরগোশ, হরিণ, বাঘ, হাতি সবাইকে আমন্ত্রণ জানানো হলো। সবাই উৎসাহ নিয়ে প্রস্তুতি নিতে শুরু করল।

“আমাদের বনের বন্ধুরা সবাই একসাথে হবে, এটা খুব আনন্দের,” রাজু বলল।

রাজু আর কাঠু বনের মধ্যে বিভিন্ন ফুল, পাতা, আর রঙিন দড়ি দিয়ে সাজসজ্জা করল। বনের প্রাণীরা ফল, বাদাম আর মধু এনে সাজালো খাবারের টেবিল।

“দেখো, সবাই মিলে একসাথে কাজ করল,” কাঠু খুশি হয়ে বলল।

সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে সবাই একসাথে বসে গল্প করল। তারা বনের গল্প শোনাল, গান গাইল আর মজা করল।

রাজু বলল, “আমাদের বন্ধুত্বের গল্প যেন বনের সব প্রাণীর কাছে পৌঁছায়।”

পরদিন সকালে সবার আগমন হলো। পাখিরা গান করল, বাঘ আর হাতি নাচল, আর খরগোশরা খেলা করল। সবাই মিলে একসাথে আনন্দ করল।

“বন আমাদের বন্ধু, আমাদের ভালোবাসা,” রাজু বলল।

সবাই মিলে খেলাধুলা করল, গল্প করল, আর নতুন নতুন বন্ধুত্ব গড়ল। কাঠু রাজুর পাশে বসে বলল, “আমি এই দিনটি কখনো ভুলব না।”

রাজু বলল, “বন্ধুত্ব আর সম্মানের মাধ্যমেই আমরা বনের শান্তি বজায় রাখব।”

সবাই সম্মত হল, আর উৎসব শেষ হলো আনন্দ আর হাসিতে।

রাতের অন্ধকারে রাজু আর কাঠু বসে আকাশের তারা দেখল। তারা ভাবল, “আমাদের বন যেন সব সময় এভাবেই ভালো থাকে।”

 

১০. একদিন সকালে রাজু আর কাঠু বনে গেল। কিন্তু আজকের সকালটা একটু ভিন্ন লাগছিল। বাতাস গরম আর বেজায় শুকনো ছিল। পাখিরা কম কুজন করছিল, আর বনের গাছপালা যেন একটু চিন্তিত।

“কাঠু, আজকের দিনটা যেন অস্বাভাবিক,” রাজু বলল। কাঠুও একটু আশঙ্কিত চোখে চারপাশ দেখল।

হাঁটতে হাঁটতে দূরের গাছগাছালির মধ্য থেকে ধোঁয়ার গন্ধ আসতে লাগল।

“দেখো, ধোঁয়া!” কাঠু চিৎকার করল।

রাজু দৌড়ে ধোঁয়ার দিকে গেল। ধোঁয়া আস্তে আস্তে আগুনে পরিণত হচ্ছিল।

আগুন দেখে বনের প্রাণীরা দৌড়ে পালাচ্ছিল। পাখিরা চিৎকার করছে, ছোট প্রাণীরা আতঙ্কিত। রাজু বুঝতে পারল এটা একটা বড় বিপদ।

“আমাদের দ্রুত কিছু করতে হবে,” রাজু বলল, “বনের প্রাণীদের সাহায্য করতে হবে।”

রাজু আর কাঠু বনের অন্য প্রাণীদের ডেকে পাঠাল। তারা সবাই মিলে আগুন নেভানোর পরিকল্পনা করল। হাতি বড় বড় কচুরিপানা নিয়ে এল, খরগোশ ও ছোট ছোট প্রাণীরা পানি আনার জন্য ছুটে লাগল।

“সবাই একসাথে কাজ করলে আমরা আগুন নেভাতে পারব,” রাজু উৎসাহ দিল।

সব প্রাণী তাদের নিজের ক্ষমতা অনুযায়ী সাহায্য করল। হাতির মতো বড় প্রাণীরা গাছ থেকে জল ঢালছিল, আর ছোট প্রাণীরা দ্রুত পানি নিয়ে আসছিল।

আগুনের সাথে তাদের লড়াই কঠিন হলেও তারা একসাথে কাজ করছিল। রাজু আর কাঠু মাথা ঠান্ডা রেখে কাজ করছিল।

“আমাদের বনের জন্য আমরা সবকিছু করব,” রাজু বলল।

কয়েক ঘণ্টার কঠোর পরিশ্রমের পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। বনের কিছু অংশ পুড়ে গেলেও বাকি বনের প্রাণীরা নিরাপদ থাকে।

আগুনের পরে বনের প্রাণীরা একসাথে বসে ক্ষতি কমানোর কথা ভাবল। রাজু বলল, “আমরা সবাই মিলে বনের পুনরুদ্ধার করব।”

রাজু আর কাঠু বুঝল, প্রকৃতির প্রতি যত্ন আর সতর্কতা প্রয়োজন। বন আমাদের বন্ধুত্ব আর ভালোবাসার জায়গা, তাই সবাইকে মিলে সেটা রক্ষা করতে হবে।

১১. একদিন সকালে রাজু আর কাঠু বনের মধ্যে হাঁটছিল। তখন তারা শোনল বনের জগতের সবচেয়ে সুন্দর, কিন্তু অতি বিরল একটি ফুলের কথা, যার নাম “জাদুকরী ফুল।” বলা হয়, এই ফুল দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি এর গন্ধে বনের সকল প্রাণী শান্তি পায় আর সুস্থ থাকে।

“আমরা কি সেই জাদুকরী ফুলটা খুঁজে পাবো?” রাজু উত্তেজিত হয়ে বলল।

“চলো, খুঁজে বের করি!” কাঠুও লেজ দুলিয়ে সম্মত হল।

রাজু আর কাঠু বনের প্রবীণ কাকাতাকে খুঁজে পেল। কাকাতা অনেক পুরনো, বনের অনেক গল্প জানে। সে বলল, “জাদুকরী ফুলটা গোপন এক জায়গায় লুকানো। যারা সত্যিকারের বন্ধুত্ব আর সাহস নিয়ে আসে, তাদের জন্য ফুলটি ফোটে।”

“সত্যিকারের বন্ধুত্ব আর সাহস!” রাজু বলল, “আমাদের তো এই দুইটাই আছে।”

তারা বনের গভীরে ঢুকল, যেখানে ঘন কুয়াশা আর অন্ধকার গাছ। অনেক সময় পায়ের নিচে ঝাঁঝরা পাতা ভাসছিল আর দূরে কেউ কেউ শিকারির ছাপ পেল।

“সাবধান হও, কাঠু,” রাজু বলল।

“তুমি চিন্তা করো না, আমি তোমার সাথে আছি,” কাঠু বলল।

পথে তারা এক প্রবাল জলাশয়ের পাশে গেল, যেখানে ঝরনার শব্দ সুরের মতো বাজছিল। ঝরনার পাশে এক বয়স্ক কচ্ছপ তাদের জানাল, “জাদুকরী ফুলটি এই ঝরনার পেছনে লুকানো আছে, কিন্তু ফুলের গন্ধ পেতে হলে আপনাদের সত্যিকারের বন্ধুত্ব প্রমাণ করতে হবে।”

রাজু ও কাঠুর মধ্যে ছোটখাটো ভুল বোঝাবুঝি হলো। কাঠু একটু আহত হল আর রাজু দুঃখ পেল। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে তারা বুঝতে পারল, প্রকৃত বন্ধুত্ব মানেই ভুল মাফ করে একসাথে চলা।

তাদের মধুর বন্ধুত্ব আবার জোরালো হলো।

যখন তারা সত্যিকারের বন্ধুত্বের শক্তি দেখাল, ঝরনার পেছনে হঠাৎ এক ছোট্ট জাদুকরী ফুল ফুটে উঠল। ফুলের গন্ধে চারপাশের বনে এক শান্তি ছেয়ে গেল।

“দেখো কাঠু, আমাদের বন্ধুত্বের জন্য ফুল ফুটেছে!” রাজু বলল।

ফুলের গন্ধে বনের প্রাণীরা সুস্থ হলো, সবাই একসাথে আনন্দ করল। রাজু আর কাঠু বুঝল বন্ধুত্বই হল প্রকৃত জাদু।

রাজু বলল, “বন্ধুত্ব, সাহস আর বিশ্বাস দিয়ে আমরা সব সমস্যার মুখোমুখি হতে পারি।”

কাঠু হাসতে হাসতে বলল, “আর আমাদের বন্ধুত্বই আমাদের শক্তি।”

১২.

একদিন বিকেলে রাজু আর কাঠু বনের এক শান্ত কোণে বিশ্রাম নিচ্ছিল। হঠাৎ এক চমকপ্রদ রংধনুর মতো এক ছোট্ট ময়ূর তাদের সামনে এসে বসল। ময়ূরটির পালকের রঙ ছিল নীল, সবুজ আর সোনালী মিশ্রিত, আর সে খুবই উৎসাহী ও বন্ধুবৎসল।

“হ্যালো! আমি ময়ূর। তোমাদের সাথে বন্ধু হতে চাই,” সে বলল।

রাজু আর কাঠু খুব খুশি হলো। রাজু বলল, “অবশ্যই, আমরা নতুন বন্ধুকে সবসময় ভালোবাসি।”

ময়ূর বলল, “আমি অন্য জঙ্গল থেকে এসেছি, কিন্তু আমার কিছু খোঁজার আছে এখানে।”

“কি খোঁজো?” কাঠু জানতে চাইল।

“আমার পরিবারের কিছু পুরনো স্মৃতি, আর নতুন বন্ধুরা,” ময়ূর বলল হাসি দিয়ে।

রাজু, কাঠু আর ময়ূর মিলে বনের আরও গভীরে যাত্রা শুরু করল। তারা ভাবল, নতুন বন্ধুর খোঁজে যাত্রা হবে মজার আর শিখার।

“আমাদের দলে তুমি অনেক সাহায্য করবে,” রাজু বলল।

যাত্রার পথে হঠাৎ গাছের পেছন থেকে এক ছাগলের ছোট দল এসে তাদের পথ আটকে দিল। ছোট ছাগলগুলো খুবই শয়তান আর দুষ্টুমি করতে চাইছিল।

“তোমরা কে? আমাদের বনে কেন এল?” একটা ছাগল জিজ্ঞেস করল।

রাজু বলল, “আমরা শান্তির জন্য এসেছি, নতুন বন্ধুদের সাথে মিলিত হতে।”

ছাগলগুলো প্রথমে বিশ্বাস করল না, কিন্তু ময়ূরের নাচ দেখে তাদের মনের ভয় দূর হলো। তারা সবাই একসাথে মিলে হাসতে লাগল।

তারা সবাই মিলে বনের এক ছোট খোলনায় গেল। সেখানে রাজু, কাঠু আর ময়ূর নতুন বন্ধুদের সাথে ফুল গাছ লাগাল, গানের সুরে বনের খুশির গান গাইল।

“বন্ধুত্ব আমাদের শক্তি,” কাঠু বলল।

দিন শেষে তারা সবাই বসে বনের গল্প শোনাল, মজার স্মৃতি ভাগ করে নিল আর নতুন দিনের স্বপ্ন দেখল।

রাজু বলল, “আমাদের বন্ধু এখন আরও বেশি হয়েছে, আমরা একসাথে বনের প্রতিটি সমস্যার মোকাবিলা করতে পারব।”

ময়ূর বলল, “বন্ধুত্ব মানেই একে অপরকে গ্রহণ করা, ভালোবাসা দেওয়া আর সাহস করা।”

তারা সবাই একসাথে রাতে বসে তারার আকাশের নিচে নতুন বন্ধুত্বের গান গাইল।

১৩. একদিন সকালে রাজু, কাঠু আর ময়ূর বনে বেড়াতে গিয়েছিল। আকাশ ধীরে ধীরে মেঘলা হতে শুরু করল। পাখিরা কিছুটা কম গান গাইছিল, আর বনের গাছপালা যেন একটু চিন্তিত লাগছিল।

“শোনো, বৃষ্টি আসছে,” ময়ূর বলল।

“আমরা কি ঝামেলা থেকে বাঁচতে পারব?” কাঠু বলল একটু উদ্বিগ্ন হয়ে।

রাজু বলল, “চল, আমরা সবাই মিলে প্রস্তুতি নিই।”

তারা বনের সব প্রাণীদের খবর দিলো যে ঝড় আসছে, সবাই নিরাপদে থাকুক। হাতি, খরগোশ, সাপ, আর পাখিরা সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ল তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে।

“আমাদের সবার একসাথে কাজ করতে হবে,” রাজু বলল।

হঠাৎই ভারী বৃষ্টি শুরু হলো। গাছগুলো দম দম করে কাঁপতে লাগল, আর বনের অনেক ছোট্ট প্রাণী ডুবে যাওয়ার আশঙ্কায় আতঙ্কিত।

“আমাদের বন্ধুদের সাহায্য করতে হবে,” কাঠু বলল।

বৃষ্টি চলাকালীন রাজু, কাঠু আর ময়ূর মিলে বনের ছোট ছোট প্রাণীদের নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। পথ বন্ধ থাকলেও, তারা একে অপরকে সাহায্য করল।

“বন্ধু মানেই বিপদে একে অপরের পাশে থাকা,” ময়ূর বলল।

বৃষ্টি শেষে বনে শান্তি নেমে এলো। সূর্য আবার হাসলো, আর বনের সব প্রাণী আবার বাইরে এল।

“দেখো, আমরা সবাই মিলে বনের সবাইকে রক্ষা করেছি,”  রাজু বলল।

বৃষ্টি অনেক ক্ষয়ক্ষতি করেছে, কিন্তু সবাই একসাথে কাজ করে বনের ক্ষতি কমাতে শুরু করল। রাজু বলল, “প্রকৃতির বিপদ থেকে বাঁচতে সবাইকে মিলে কাজ করতে হবে।”

বনের প্রাণীরা বুঝল বন্ধুত্ব, সাহস আর একতাই তাদের বাঁচাবে। তারা আবার একত্রিত হলো, নতুন আশা নিয়ে।

১৪. সকালের সূর্য ধীরে ধীরে জঙ্গলের মধ্যে আলো ছড়িয়ে দিচ্ছিল। রাজু, কাঠু আর ময়ূর ছোট এক টিলার ওপরে বসে কথা বলছিল।

রাজু:

“আমাদের তো অনেক অভিযান হয়েছে। কিন্তু আজকে আমি চাই নতুন কিছু খুঁজতে যেতে।”

কাঠু:

“নতুন কিছু? সেটা কি?”

ময়ূর:

“আমি শুনেছি বনের অনেক গভীরে একটা রহস্যময় ঝর্ণা আছে, যেটা নাকি বছরের মাত্র কয়েকদিন দেখা যায়।”

রাজু তার দাদুর কাছ থেকে পাওয়া পুরনো মানচিত্রটা বের করল। সেখানে একটা সরু লাল রেখা এঁকে ঝর্ণার পথ দেখানো ছিল।

রাজু:

“এটাই আমাদের গন্তব্য! তবে পথ অনেক কঠিন হবে।”

তারা তিনজন পরিকল্পনা শুরু করল। বনের অন্যান্য বন্ধুরা খবর পেয়ে সাহায্য করতে এগিয়ে এল।

হাতি মামা বিশাল পানির কলসি নিয়ে এল।

খরগোশ দাদা শুকনো ফল আর বাদাম দিল।

টিয়া পাখি দিদি আকাশ থেকে পথ দেখার দায়িত্ব নিল।

সবাই মিলে রওনা দেওয়ার আগে হাতি মামা বলল:

হাতি মামা:

“সাবধানে থেকো বাচ্চারা। এই পথ অনেকেই চেনেনা। তবে তোমাদের সাহস আছে।”

তিন বন্ধু একে অপরের হাত ধরল। রাজু বলল:

“চলো! আমাদের অভিযান শুরু হোক!”

যতই তারা ভেতরে এগিয়ে যেতে লাগল, জঙ্গল ক্রমশ ঘন হতে লাগল। বনের পাখিরা কিচিরমিচির থামিয়ে দিল। হালকা কুয়াশা নামল।

কাঠু (ভয় পেয়ে):

“রাজু, এই জায়গাটা তো বেশ ভুতুড়ে মনে হচ্ছে।”

ময়ূর (সান্ত্বনা দিয়ে):

“ভয় পেয়ো না। আমরা একসাথে আছি, তাই কিছু হবে না।”

কিছুদূর এগিয়ে হঠাৎ মাটির নিচ থেকে সরু সরু লতাগুলি রাজুর পা পেঁচিয়ে ফেলল।

রাজু:

“ওহ! বাঁচাও!”

কাঠু দ্রুত দাঁত দিয়ে লতাগুলো কেটে ফেলল। রাজু উঠে দাঁড়িয়ে বলল:

“তোমার জন্যই আমি বেঁচে গেলাম কাঠু। এই হল বন্ধুত্বের আসল রূপ।”

এগিয়ে যেতে যেতে তারা সামনে পেল এক ক্ষীণ স্রোতের নদী। তার ওপর কোনও সাঁকো ছিল না।

ময়ূর:

“আমার তো ডানা আছে, আমি উড়ে যেতে পারি। কিন্তু তোমরা?”

রাজু (ভাবনা করে):

“আমরা গাছের পাতা আর লতাগুলো দিয়ে ভাসমান এক নৌকা বানাই।”

তারা সবাই মিলে ছোট্ট ভেলা বানাল। ধীরে ধীরে স্রোত পেরিয়ে গেল। কাঠু মাঝেমাঝে লাফিয়ে নৌকাটিকে ভারসাম্য রাখছিল।

শেষমেশ দুপুরের দিকে তারা পৌঁছাল এক বিশাল পাথরের দেওয়ালের সামনে। উপরে পানি পড়ছে সূক্ষ্ম সোনালী ধারায়।

ঝর্ণার জল এতই স্বচ্ছ যে নিচের নুড়িগুলো দেখা যায়। চারপাশে রঙিন প্রজাপতিরা উড়ছে।

কাঠু (মুগ্ধ হয়ে):

“ওহ! এটা তো স্বপ্নের মতো সুন্দর!”

ময়ূর:

“এই ঝর্ণার জল নাকি বনের সব প্রাণীর জন্য আশীর্বাদ বয়ে আনে।”

তারা ঝর্ণার পাশে বসে বিশ্রাম নিলো। ময়ূর নাচতে লাগল, কাঠু গাইতে লাগল। রাজু চোখ বন্ধ করে শান্তির সেই বাতাস উপভোগ করল।

কিন্তু আনন্দ বেশিক্ষণ থাকল না। হঠাৎ মেঘ করে বৃষ্টি নামল। প্রবল বাতাসে ঝর্ণার পানি ফুলে উঠল। কাছাকাছি একটা গাছ উপড়ে পড়তে চলেছে।

রাজু:

“দ্রুত নীচে নামো! বড় গাছটা পড়ে গেলে বিপদ হবে।”

ময়ূর দ্রুত উড়ে গেল, কাঠু লাফিয়ে সরল, আর রাজু গাছের গোড়া থেকে বেরিয়ে গেল।

গাছটা ঠিক রাজুর পেছনেই পড়ল, কিন্তু সে রক্ষা পেল।

ঝড় থেমে গেলে তিন বন্ধু আবার বসে পড়ল।

রাজু:

“আজ বুঝলাম প্রকৃতি যেমন সুন্দর হতে পারে, তেমনি শক্তিশালীও।”

কাঠু:

“তাই আমাদের সবসময় প্রকৃতির সাথে বন্ধুত্ব রাখতে হবে।”

ময়ূর:

“আর পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস রাখতে হবে। তাহলেই আমরা সব বিপদ কাটিয়ে উঠতে পারব।”

তারা একে অপরের হাত ধরল। সূর্য আবার বেরিয়ে এল। আর দূরের পাহাড়ের ওপরে রংধনু ফুটে উঠল।

১৫. ঝর্ণা থেকে ফিরে এসে রাজু, কাঠু আর ময়ূর বনের ছোট খোলায় বিশ্রাম নিচ্ছিল। হঠাৎই দূর থেকে এক অদ্ভুত কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

কণ্ঠস্বর:

“কে আছো ওখানে? আমার একটু সাহায্য দরকার।”

রাজু চারদিকে তাকিয়ে দেখল — ঝোপের মাঝে আটকে আছে এক সোনালী পালকের পাখি। তার ডানা মাটির নিচের এক লতায় জড়িয়ে গেছে।

সোনালী পাখি (কান্নার স্বরে):

“আমার নাম সোনা। আমি উড়তে পারছি না। কেউ কি আমাকে বাঁচাবে?”

রাজু কোনো দ্বিধা না করে দৌড়ে গেল। কাঠু তার ক্ষুদে দাঁত দিয়ে লতা কাটতে লাগল। ময়ূর সাহস দিল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই পাখিটি মুক্ত হল। সোনা তার রেশমি পালক ঝাড়ল আর বলল:

সোনা:

“তোমরা না থাকলে আজ হয়তো আর বেঁচে থাকতাম না। তোমরা কি আমার বন্ধু হবে?”

রাজু:

“অবশ্যই! আমাদের দলের নতুন সদস্য তুমি।”

সোনার চোখে আনন্দের জল ঝরল।

সোনা বসে তার জীবনের গল্প বলতে শুরু করল।

সোনা:

“আমি সোনালী পাখিদের দল থেকে এসেছি। আমরা সবাই বনের অনেক উঁচু গাছে বাস করি। কিন্তু গতকাল হঠাৎ এক বাজপাখি আক্রমণ করে। আমি পালাতে গিয়ে এ লতায় আটকে যাই।”

রাজু ও কাঠু অবাক হয়ে শুনল। ময়ূর বলল:

ময়ূর:

“বাজপাখি এখনো কি এখানে আছে?”

সোনা:

“হ্যাঁ। সে পুরো অঞ্চলে আতঙ্ক ছড়িয়ে রেখেছে। অনেক পাখি এখনও লুকিয়ে আছে।”

সোনা যখন কথা বলছিল, ঠিক তখনই দূর থেকে বাজপাখির ভয়ঙ্কর ডাক শোনা গেল।

বাজপাখি (দূর থেকে গর্জে উঠল):

“কে আমার শিকারকে বাঁচালে? এই বনে আমারই শাসন!”

রাজু ভয় পেলেও সাহস হারাল না।

রাজু:

“না, এই বনে বন্ধুত্বের শাসন চলবে, ভয় নয়।”

তিন বন্ধু সোনাকে নিয়ে বনের বাকি প্রাণীদের ডেকে আনল। হাতি মামা, খরগোশ দাদা, টিয়া দিদি, কুমির কাকা সবাই একসাথে এক পরিকল্পনা করল।

হাতি মামা:

“আমরা সবাই মিলে বাজপাখিকে ভয় দেখাব। সে যেন বুঝতে পারে, এখানে একতার শক্তি সবচেয়ে বড়।”

তারা সবাই মিলে কাজ ভাগ করে নিল।

হাতিরা জলে ঝাঁপ দিয়ে বড় বড় ঢেউ তুলবে।

কাঠু লতা দিয়ে ফাঁদ তৈরি করবে।

ময়ূর আর টিয়া আকাশে উড়বে, বাজপাখিকে বিভ্রান্ত করবে।

রাজু ও সোনা ফাঁদের দিকে তাকে টেনে আনবে।

পরের দিন সকালে বাজপাখি আকাশ থেকে নামল। তার চোখ রাগে জ্বলছিল।

বাজপাখি:

“এত সাহস! আমাকে থামাবে?”

ময়ূর আর টিয়া তার সামনে উড়তে লাগল, তাকে ভুলপথে টানতে লাগল।

বাজপাখি ক্ষেপে গিয়ে নিচে নামতেই কাঠুর তৈরি লতার ফাঁদে আটকে গেল। তারপর হাতি মামারা বড় ঢেউ তুলে তাকে ভিজিয়ে দিল।

বাজপাখি এক পর্যায়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ে গেল।

বাজপাখি বুঝতে পারল তার অহংকারই তার বিপদ ডেকে এনেছে। সে লজ্জিত হয়ে বলল:

বাজপাখি:

“আমি ভুল করেছি। একা থাকা কখনোই ভালো নয়। তোমরা চাইলে আমিও বন্ধু হতে চাই।”

রাজু তার হাত বাড়িয়ে বলল:

রাজু:

“ভালো, আমরা চাই সবাই মিলে শান্তিতে থাকুক।”

পরদিন পুরো বনে এক বড় উৎসব হলো। বনের প্রাণীরা গান গাইল, নাচল, মধু খেল। সোনালী পাখিরা আবার নীড়ে ফিরে গেল। বাজপাখিও মিলে গেল সবার সঙ্গে।

কাঠু (হেসে):

“বন্ধুত্বের শক্তি কত বড়, তাই না রাজু?”

রাজু:

“সত্যি তাই! ভয় আর অহংকারকে একতা আর বন্ধুত্ব হারিয়ে দিতে পারে।”

সন্ধ্যায় সবাই বসে তারার নিচে গল্প করল।

১৬. সকালের হালকা রোদ পড়েছে বনের পাতায় পাতায়। বাতাসে হালকা মিষ্টি গন্ধ। রাজু, কাঠু, ময়ূর আর সোনা ঝর্ণার পাশে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিল।

সোনা তার ডানার পালক ঠিক করতে করতে বলল:

সোনা:

“তোমরা কি শুনেছ? বনের অন্য পাশে আছে এক যাদুকরী ফুল — যেটা নাকি রোদের আলোয় পাল্টে যায়!”

কাঠু চোখ বড় বড় করে বলল:

কাঠু:

“ওই ফুল কি সত্যিই আছে?”

ময়ূর:

“আমি শুধু কিংবদন্তি শুনেছি। কেউই সঠিকভাবে দেখেনি।”

রাজু তখনই ঘোষণা করল:

রাজু:

“তাহলে চল, আমরা নিজের চোখে দেখে আসি। এটা হবে আমাদের নতুন অভিযান।”

বনের সব বন্ধু আবার একসাথে হল। তারা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সঙ্গে নিল।

হাতি মামা দিল পানির থলে।

খরগোশ দাদা দিল শুকনো খাবার।

টিয়া দিদি আকাশপথ থেকে নজরদারির দায়িত্ব নিল।

সবার দলে যোগ হলো নতুন বন্ধু বাজপাখিও।

বাজপাখি:

“তোমাদের ভুল ছিল না। একসাথে চললে যেকোনো বিপদ জয় করা যায়।”

গহীন জঙ্গলের অজানা পথে রওনা দিল দলটি। পথটি ছিল রুক্ষ, পাথুরে আর মাঝে মাঝে সংকীর্ণ।

কখনো শুকনো পাতা খসখস শব্দ করছিল। কখনো হঠাৎ শেয়াল ডেকে উঠছিল।

কাঠু একটু ভয় পেয়ে বলল:

কাঠু:

“এত নীরবতা কেন? কিছু একটা অস্বাভাবিক না?”

রাজু (হেসে):

“ভয় পাস না। আমরা একসাথে আছি।”

এগোতে এগোতে তারা এসে পড়ল এক ভাঙা সাঁকোর কাছে। নিচে ভয়ানক নদী। সাঁকো টলমল করছে।

ময়ূর ও বাজপাখি উড়ে গেল। কিন্তু রাজু আর কাঠুকে পার হতে হবে ধীরে ধীরে।

সাঁকো হঠাৎ করে শব্দ করল —

কড়াচ… কড়াচ…

রাজু (কাঠুকে শান্ত করে):

“ধীরে এগিয়ে চল। এক পা এক পা করে।”

তারা সফলভাবে পার হয়ে গেল।

দীর্ঘ পথ পেরিয়ে তারা পৌঁছাল এক রূপকথার মত উপত্যকায়। দূরে পাহাড়ের ঢালে রোদের আলোয় চিকচিক করছে সেই যাদুকরী ফুল।

ফুলটির পাঁপড়ি সোনালী থেকে নীল রঙে বদলে যাচ্ছিল। মাঝে মাঝে লালচে আভা ছড়িয়ে পড়ছিল চারপাশে।

সোনা:

“ওহ! এত সুন্দর জিনিস কখনো দেখিনি।”

ময়ূর:

“এই ফুলের নাম ‘রঙপরী ফুল’। এর গন্ধ নাকি যে কাউকে শান্তি এনে দেয়।”

কিন্তু ঠিক তখনই এক রহস্যময় আওয়াজ ভেসে এল। এক বিশাল বনে ঢেকে থাকা বড় কচ্ছপ সামনে এল।

কচ্ছপ:

“কে তোমরা? এখানে এলেই চলবে না। এই ফুলের পাহারাদার আমি।”

রাজু সাহস নিয়ে এগিয়ে বলল:

রাজু:

“আমরা কোনো ক্ষতি করতে আসিনি। আমরা শুধু এই ফুল দেখতে চেয়েছিলাম।”

কচ্ছপ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল:

কচ্ছপ:

“তোমাদের চোখে সত্যতা দেখছি। তোমরা চাইলেই ফুলের পাশে কিছুক্ষণ বসতে পারো। কিন্তু কেউ ফুল ছিঁড়বে না।”

তারা সবাই ফুলের চারপাশে বসল। তার মিষ্টি সুবাসে চারপাশটা যেন শান্তিতে ভরে গেল। বাতাসের শব্দটাও যেন গান হয়ে উঠল।

কাঠু:

“এত সুন্দর জায়গায় দুনিয়ায় আর আছে?”

বাজপাখি:

“প্রকৃতির সৌন্দর্য আমাদের চোখ খুলে দেয়। শুধু নিতে নয়, দিতে শিখতে হয়।”

কচ্ছপও বলল:

কচ্ছপ:

“যারা প্রকৃতিকে ভালোবাসে, প্রকৃতিও তাদের ভালোবাসে।”

বিকেলের দিকে তারা আবার বনের পথ ধরল। সবাই খুশি মনে ফিরে যাচ্ছিল।

রাজু বলল:

রাজু:

“আজকের অভিযানে আমরা শিখলাম — প্রকৃতির প্রতিটি জিনিসের পেছনেই আছে মমতা আর দায়িত্ব।”

কাঠু বলল:

কাঠু:

“আর একসাথে থাকলে যেকোনো অভিযান সফল হয়।”

সূর্যাস্তের লাল আলোয় পুরো জঙ্গল রাঙিয়ে উঠল।

১৭. এক সুন্দর সকালে রাজু, কাঠু, ময়ূর, সোনা এবং বাজপাখি সকলে মিলে জঙ্গলের ছোট এক পুকুরের ধারে বসে বিশ্রাম করছিল। হালকা বাতাসে পুকুরের পানি কাঁপছিল। পাখিরা কিচিরমিচির করছে।

রাজু:

“এখন তো অনেক অভিযান শেষ হয়েছে। কিন্তু বনের উত্তর দিকে নাকি এক পুরনো অরণ্যের গোপন পথ আছে। দাদু ছোটবেলায় বলতেন — সেই পথে এক সময় বনের জাদুকররা যেত।”

কাঠু (উত্তেজিত হয়ে):

“জাদুকরের পথ? এটা তো খুবই রোমাঞ্চকর হবে!”

ময়ূর:

“তবে শুনেছি সেই পথ নাকি খুবই বিপজ্জনক।”

সোনা (হালকা গলায়):

“যদি আমরা একসাথে থাকি, তাহলে কোনো ভয় নেই।”

রাজু সাহস করে বলল:

রাজু:

“চল, আজ আমরা সেই রহস্যময় গোপন পথের সন্ধানে বের হই।”

তারা উত্তর দিকের ঘন অরণ্যের দিকে রওনা দিল। পথটি সরু, অনেক পুরনো, আর অনেক জায়গায় লতা-পাতা দিয়ে ঢাকা।

টিয়া দিদি আকাশ থেকে পথ দেখাতে লাগল। কাঠু মাঝেমধ্যে তার ছোট্ট দাঁত দিয়ে লতা কেটে দিচ্ছিল।

হঠাৎ এক পুরনো পাথরে অদ্ভুত এক চিহ্ন দেখতে পেল রাজু।

রাজু (হাত দিয়ে ছুঁয়ে):

“এটা বোধহয় জাদুকরদের চিহ্ন। এটাই আমাদের সঠিক পথ।”

যতই তারা এগিয়ে যেতে লাগল, ততই ঘন অরণ্য আরও অন্ধকার হতে লাগল। দিনের আলোও যেন ভিতরে প্রবেশ করতে ভয় পাচ্ছিল।

হঠাৎ ঝোপের আড়াল থেকে ভেসে এলো বিড়াল জাতীয় এক অদ্ভুত জন্তুর গর্জন।

বাজপাখি (ডানা মেলে):

“সাবধান! এটা জংলি শাবক।”

কিন্তু রাজু তার শান্ত কণ্ঠে বলল:

রাজু:

“ভয় পেও না। ও ক্ষতি করবে না, যদি আমরা শান্ত থাকি।”

জন্তুটি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে সরে গেল। সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।

আরও খানিক এগিয়ে গিয়ে তারা দেখতে পেল এক বিশাল পাহাড়ি দেয়াল। দেয়ালের মাঝে এক ছোট দরজা, যা প্রায় লতাপাতায় ঢেকে আছে।

সোনা:

“এটাই সেই গোপন দরজা!”

কাঠু (হাতের লতা সরিয়ে):

“কিন্তু এটা তো বন্ধ। কীভাবে খুলব?”

রাজু দাদুর শেখানো কথা মনে করে দরজার ঠিক উপরের পাথরের নিচ থেকে ছোট একটা কাঠের চাবি বের করল।

রাজু (হেসে):

“দাদু বলেছিলেন — ‘সঠিক জায়গায় খুঁজলে, সঠিক পথ খুলবেই।'”

চাবি ঘোরাতেই দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে গেল।

দরজা পেরিয়ে তারা ঢুকে পড়ল এক অন্য জগতে। ভেতরে রঙিন আলো, বাতাসে ঝুলে থাকা রুপালী ফুল, আর মিষ্টি সুবাস। গাছগুলোর ডাল থেকে ঝুলে থাকা রত্নের মত আলোকছটা চারদিকে জ্বলছিল।

ময়ূর (অবাক হয়ে):

“এটা তো স্বপ্নের মতো সুন্দর!”

বাজপাখি:

“এটাই সেই পুরনো জাদুকরদের বাসস্থান।”

অরণ্যের মাঝে একটা গোলাকার মঞ্চের উপর রাখা ছিল এক চকচকে নীল পাথর। তার আশেপাশে অনেক সোনালী অক্ষরে কিছু লেখা।

রাজু (পাথরের কাছে গিয়ে):

“এ পাথর নাকি শক্তি ও জ্ঞান দেয়, কিন্তু শুধুমাত্র যারা প্রকৃতির নিয়ম মেনে চলে, তারাই এই শক্তি পায়।”

তারা সবাই একে একে পাথরের সামনে গিয়ে হাত রাখল। হঠাৎ চারপাশে হালকা আলো ছড়িয়ে পড়ল। বাতাসে মিষ্টি সুর বাজতে লাগল। মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি তাদের আর্শীবাদ করছে।

পাথরের আলো নিভে গেলে চারপাশ আবার শান্ত হয়ে গেল। কিন্তু তাদের মনের মধ্যে এক নতুন শক্তি জেগে উঠল। তারা বুঝতে পারল প্রকৃতির সঙ্গে সুর মেলানোই প্রকৃত শক্তি।

কাঠু (চোখে জল নিয়ে):

“প্রকৃতির শক্তি কত সুন্দরভাবে আমাদের শেখাল — লোভ নয়, মমতা ও বন্ধুত্বই বড়।”

রাজু:

“আজকের শিক্ষা আমরা সারাজীবন মনে রাখব।”

অবশেষে তারা সেই গোপন পথ পেরিয়ে আবার নিজের চেনা বনে ফিরে এল। পুরো বনের প্রাণীরা তাদের এই নতুন অভিযানের গল্প শুনে আনন্দে হাততালি দিল।

হাতি মামা:

“তোমরা আবার প্রমাণ করলে বন্ধুত্ব, সাহস আর একতার শক্তি কত বড়।”

সূর্য অস্ত যেতে যেতে বনের ওপরে সোনালী আভা ছড়িয়ে দিল। পাখিরা ফিরে গেল নীড়ে। আর রাজু, কাঠু, ময়ূর, সোনা ও বাজপাখি নতুন রোমাঞ্চের অপেক্ষায় থাকল।

১৮. একদিন সকালে রাজু, কাঠু, ময়ূর, সোনা এবং বাজপাখি ঝর্ণার ধারে বসে গল্প করছিল। হঠাৎ দূর থেকে এক মিষ্টি অথচ চিন্তিত কণ্ঠস্বর শোনা গেল:

কণ্ঠস্বর:

“কেউ আছো? দয়া করে সাহায্য করো!”

কণ্ঠস্বরটা যেন বাতাসের সাথে মিশে আসছিল। সবাই অবাক হয়ে কান পেতে শুনল।

রাজু (কৌতূহলী হয়ে):

“কোথা থেকে এল এই আওয়াজ?”

ময়ূর:

“বনের উত্তর-পূর্ব দিক থেকে আসছে।”

কাঠু (উত্তেজনায়):

“চলুন দেখি কী হয়েছে। হয়তো কারও বিপদ হয়েছে।”

দলটি দ্রুত উত্তর-পূর্ব দিকে যাত্রা শুরু করল। পথ অনেক বেশি দুর্গম। বড় বড় কাঁটা, উঁচু গাছের ঝোপে ঢাকা, আর মাটির মাঝে অনেক গর্ত।

বাজপাখি আকাশ থেকে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছিল। হঠাৎ সে নেমে এল:

বাজপাখি:

“আমি দূরে এক বিশাল বটগাছ দেখেছি। তার নিচে কারা যেন দাঁড়িয়ে আছে।”

তারা কাছে গিয়ে দেখল— বিশাল বটগাছের নিচে এক রাজকন্যা বাঁধা অবস্থায় বসে আছে। তার পরনে সোনালী জামা, মাথায় ফুলের মুকুট। তার পাশে দুই শেয়াল প্রহরায় দাঁড়িয়ে আছে।

রাজকন্যা (অশ্রুসিক্ত চোখে):

“আমার নাম রাজকন্যা চন্দ্রলতা। আমি বনের প্রাচীন রাজপরিবারের সদস্য। এই শেয়ালরা আমাকে অপহরণ করেছে।”

কাঠু (রাগে):

“এটা খুব অন্যায়!”

রাজু (দৃঢ় কণ্ঠে):

“আমরা তোমাকে মুক্ত করব।”

তারা দ্রুত পরিকল্পনা করল:

ময়ূর এবং সোনা শেয়ালদের মনোযোগ ভিন্নদিকে সরাবে।

বাজপাখি উপর থেকে শেয়ালদের ভয় দেখাবে।

কাঠু গাছের পাশ থেকে দড়ি কাটবে।

রাজু রাজকন্যাকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাবে।

ময়ূর তার রঙিন পেখম মেলে নাচ শুরু করল। সোনা তার মিষ্টি গলায় গান গাইল। শেয়ালরা বিভ্রান্ত হয়ে তাকিয়ে রইল।

ঠিক সেই সময় বাজপাখি তার বড় ডানায় ঝাপটা দিয়ে শেয়ালদের আরও ভয় দেখাল। কাঠু তার ধারালো দাঁত দিয়ে দড়ি কাটতে লাগল।

দড়ি কেটে যেতেই রাজু দ্রুত এগিয়ে গিয়ে রাজকন্যাকে ধরে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে গেল।

শেয়ালরা যখন বুঝল তারা পরাজিত, তখন পালানোর চেষ্টা করল। কিন্তু বনের অন্যান্য প্রাণীরা — হাতি মামা, খরগোশ দাদা, টিয়া দিদি — আগেই এসে হাজির হল।

হাতি মামা শুঁড় দিয়ে শেয়ালদের ধরল।

হাতি মামা (গম্ভীর কণ্ঠে):

“বনের নিয়ম ভাঙলে শাস্তি পেতেই হবে।”

শেয়ালরা ক্ষমা চাইতে লাগল। রাজকন্যা বলল:

রাজকন্যা:

“তোমরা যদি সত্যিই অনুতপ্ত হও, তবে ভালো কাজ করে বনের উপকার কর।”

শেয়ালরা মাথা নিচু করে রাজি হল।

রাজকন্যা চন্দ্রলতা বন্ধুদের রাজপ্রাসাদে আমন্ত্রণ জানাল। তারা সবাই প্রথমবারের মত রাজপুরীর ভিতরে প্রবেশ করল।

রাজপ্রাসাদের চারদিকে রঙিন ফুলের বাগান, ঝর্ণা, আর সোনালী ধাতুর তৈরি মিনার।

রাজা ও রানীও এসে বন্ধুদের অভিনন্দন জানালেন।

রাজা:

“তোমরা বনের সত্যিকারের বীর। বন্ধুত্ব, সাহস আর মমতার শক্তিই বড়।”

বন্ধুদের সবাইকে সোনালী পদক দেওয়া হল। রাজপুরীতে বড় উৎসব শুরু হল। প্রাণীরা গান গাইল, নাচল, আর মধু ও ফলের ভোজ চলল।

রাজু, কাঠু, ময়ূর, সোনা, বাজপাখি — সবাই মিলেই আজ এক নতুন বন্ধনের উদাহরণ স্থাপন করল।

কাঠু (আনন্দে):

“এটাই আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় অভিযান ছিল!”

রাজু (হেসে):

“আরও অনেক অভিযান অপেক্ষা করছে। কারণ বন্ধুত্ব মানেই তো একসাথে নতুন পথ খোঁজা।”

সূর্য অস্ত যাওয়ার সাথে সাথে তারা সবাই তারার নিচে বসে নতুন স্বপ্নের কথা ভাবল।

১৯. রাজপুরী থেকে ফিরে আসার পর একদিন সকালে রাজু তার পিঠের ছোট ব্যাগ খুলে দেখতে পেল, সেখানে একটি অদ্ভুত জিনিস রয়েছে — একটি ছোট কাঠের ঘড়ি। ঘড়ির কাঁটা চলছে না, কিন্তু ঘড়িটির উপর খোদাই করা আছে:

“সময় শুধু সামনে চলে না, কিছু সময় পেছনেও ফিরে দেখা যায়।”

রাজু (কৌতূহলে):

“এটা কে দিল? আমি তো এমন কিছু নিইনি!”

কাঠু (ঘড়িটা হাতে নিয়ে):

“দেখ, এখানে একটা গোপন বোতাম আছে!”

সোনা:

“এই ঘড়ি দেখে তো মনে হচ্ছে এর ভিতরে কোনো জাদুকরী রহস্য আছে।”

কাঠু ঘড়ির বোতাম চেপে দিল। হঠাৎ চারপাশে বাতাস ঘুরে উঠল, চোখ ধাঁধানো আলো চারদিক ঢেকে ফেলল।

পলকের মধ্যেই তারা পৌঁছে গেল এক অন্য সময়ের বনভূমিতে।

তারা চারপাশে তাকিয়ে দেখে সবকিছু যেন পুরোনো — গাছের আকার ছোট, পাখিরা অচেনা, আর বনের প্রাণীরাও দেখতে অল্প বয়সী।

ময়ূর (আত্মচিন্তায়):

“আমরা কি… অতীতে চলে এসেছি?”

সবচেয়ে আশ্চর্য ঘটনা ঘটল তখনই। হঠাৎ রাজু একটি ছোট ছেলেকে দেখতে পেল — দেখতে একদম তার মত, কিন্তু বয়স কম।

ছোট রাজু:

“আমি রাজু। আমি একা খেলছি। তুমিও কি খেলবে?”

রাজু বুঝল — এ যে তারই ছোটবেলার ছায়া!

রাজু (মনটা গলে গেল):

“তুমি একা কেন?”

ছোট রাজু (চোখ নামিয়ে):

“বন্ধু নেই। সবাই বলে আমি খুব সাধারণ।”

রাজু হাঁটু গেঁড়ে বসে বলল:

রাজু:

“তুমি জানো না, একদিন তুমি হবে বনের শ্রেষ্ঠ বন্ধু, সাহসী অভিযাত্রী!”

এদিকে কাঠু দেখতে পেল ছোট্ট এক গাছ, যেটা ভবিষ্যতে বিশাল বটগাছ হবে — যেখানে রাজকন্যা বন্দি ছিল।

ময়ূর দেখল এক ডিম ফাটছে, সেখান থেকে তারই ছোট রূপ বের হচ্ছে।

সবাই বুঝতে পারল — সময় যেমন এগিয়ে চলে, তেমনি পেছন ফিরে দেখলে শেখার সুযোগ তৈরি হয়।

এক বৃদ্ধ কচ্ছপ ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। তার চোখে জ্ঞান আর মুখে শান্তি।

বৃদ্ধ কচ্ছপ:

“তোমরা সময়ের ভেতর দিয়ে হেঁটে চলেছ। তোমাদের হৃদয়ে ভালোবাসা আছে, তাই সময়ও তোমাদের কথা শোনে।”

কচ্ছপ তাদের বলল:

কচ্ছপ:

“তোমরা যদি সময়ের এই শিক্ষা মনে রাখো, তাহলে ভবিষ্যতে তোমরা আরও শক্তিশালী হবে।”

রাজু ঘড়িটা আবার হাতে নিল। কাঁটা এবার চলতে শুরু করল। চারপাশ আবার ঘূর্ণি দিয়ে ঘুরে উঠল।

এক ঝলক আলোয় তারা বর্তমানের বনে ফিরে এলো।

ফিরে এসে তারা বুঝল কিছু যেন বদলে গেছে। রাজু আগের চেয়ে অনেক বেশি শান্ত, কাঠু আরও দায়িত্বশীল, ময়ূর গান গাইছিল ধীরে ধীরে — যেন সময়ের সুর বুকে নিয়ে।

সোনা (হেসে):

“আমরা শুধু জায়গা বদলাইনি, মনে হয় নিজেদেরও একটু বদলে এনেছি।”

রাজু (চোখ তুলে):

“সময় আমাদের শেখালো — পেছনের ভুল, ছোট ছোট দুঃখ, আর একাকীত্বই হয়তো সামনে এগিয়ে যাওয়ার জ্বালানি হয়ে দাঁড়ায়।”

পরদিন তারা এক শিক্ষা দিবসের আয়োজন করল। সেখানে ছোট ছোট প্রাণীদের সামনে দাঁড়িয়ে তারা বলল—

রাজু:

“ভবিষ্যতের জন্য তৈরি হতে হলে, মাঝে মাঝে পেছন ফিরে দেখা দরকার। কারণ পুরনো ভুল শেখায়, পুরনো ভালোবাসা পথ দেখায়।”

কাঠু:

“বন্ধুদের পাশে থাকো, মনে রেখো — সময় আর বন্ধু কখনো অপেক্ষা করে না।”

ময়ূর (সুর করে):

“যার মনে আছে ভালোবাসা, তার সঙ্গে সময়ও বন্ধুত্ব করে।”

ঘড়িটা এবার তারা রেখে দিল বনের পাঠাগারে — যাতে ভবিষ্যতের শিশু বন্ধুরা সময়ের গল্প জানতে পারে।

ঘড়ির পাশে একটি ছোট ফলকে লেখা হলো:

“বন্ধুত্বের ঘড়ি: যে সময়কে বদলে দেয় ভালোবাসায়।”

সূর্য তখনো ডুবে যায়নি। আলো নরম হয়ে বনের উপর পড়ে আছে। সবাই মিলে আজকের দিনটিকে মনে রাখল— একসময়, একদল বন্ধু, সময়ের মধ্য দিয়ে হেঁটে এসেছিল।

২০. এক গভীর রাতে রাজু, কাঠু, ময়ূর, সোনা ও বাজপাখি সবাই ঝর্ণার ধারে বসে আকাশের তারা দেখছিল। হঠাৎ করেই তারা দেখতে পেল আকাশে এক অদ্ভুত রুপালি আলো। সেটা যেন ধীরে ধীরে নেমে এসে বনের ঠিক মাঝখানে পড়ল।

রাজু (উত্তেজিত হয়ে):

“ওই আলোটা তো এক জায়গায় পড়ল! চল সবাই, দেখি ওটা কী!”

কাঠু:

“আমার মনে হচ্ছে এটা কোন যাদুকরী কিছু!”

সোনা:

“এটা কি চাঁদের আলো? না কি… চাঁদের কোনো দানব?”

ময়ূর (শান্ত কণ্ঠে):

“আলো সবসময় ভয় দেখায় না। কখনো কখনো আলোই নিয়ে আসে নতুন গন্তব্য।”

তারা সবাই একসাথে বনের মাঝখানে এসে দেখল — সেখানে এক গোলাকার উজ্জ্বল গহ্বর তৈরি হয়েছে। সেটার ভিতর থেকে ধোঁয়ার মতো রুপালি কুয়াশা বের হচ্ছে।

গহ্বরের পাশে এক চকচকে পাথরে লেখা:

“যারা সত্যিকার বন্ধু, তারা পাবে চাঁদের উপত্যকার পথ।”

রাজু (দৃঢ় কণ্ঠে):

“তাহলে আমাদের জন্যই এই পথ।”

বাজপাখি:

“তবে সাবধান থাকতে হবে। চাঁদের আলো যেমন কোমল, তেমনি রহস্যময়।”

রুপালি ধোঁয়ার মধ্যে এক ফাটলের মতো দরজা তৈরি হলো। সবাই একে একে প্রবেশ করল। চোখের সামনে ধীরে ধীরে খোলে এক অন্য জগত— চাঁদের উপত্যকা।

সাদা-বেগুনি ফুলে ভরা মাটি, উপরে উড়ছে আলোকপোকারা, আর ছোট ছোট জ্যোতির্বিন্দু বাতাসে নাচছে।

এক জায়গায় তারা দেখতে পেল এক বিশাল গাছ, যেটার পাতা যেন রুপার তৈরি, আর প্রতিটি পাতায় ছোট ছোট ছবি ফুটে উঠছে— তাদেরই ছবি, তাদের প্রতিটি অভিযান!

কাঠু (চমকে):

“এ তো আমাদের স্মৃতি!”

গাছটার নিচে বসে আছে এক জ্যোতির্ময় বৃদ্ধ— সাদা চুল, রুপালি পোশাক, হাতে এক ছোট বাঁশি।

বৃদ্ধ (হেসে):

“আমি চাঁদের উপত্যকার রক্ষক। যারা নিঃস্বার্থ ভালোবাসে, কেবল তারাই এখানে প্রবেশ করতে পারে।”

রাজু:

“আমরা জানতে চাই, এই উপত্যকার গোপন অর্থ কী?”

বৃদ্ধ:

“এই উপত্যকা হলো হৃদয়ের আয়না। এখানে যা দেখা যায়, তা আত্মার প্রতিচ্ছবি।”

বৃদ্ধ বলল, “তোমাদের যদি সত্যিই বন্ধুত্ব গভীর হয়, তবে এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর একসাথে দিতে পারবে না— তবে অনুভব করবে।”

হঠাৎ আকাশে জ্বলজ্বল করে তিনটি প্রশ্ন লেখা হলো—

১. যার পাশে থেকে ভয় কেটে যায়, সে কে?

২. যে নিজে না খেয়ে তোমাকে খেতে দেয়, সে কে?

৩. যে তোমার ভুল বুঝেও তোমার পাশে থাকে, সে কে?

সবাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। কিছু বলল না, শুধু একে অপরের চোখে তাকাল। কেউ কারও দিকে অভিযোগের চোখে নয়, বরং ভালোবাসার দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

ঠিক তখনই আকাশে শব্দ হলো, রুপালি কুয়াশা চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল, আর বৃদ্ধ হাসলেন।

বৃদ্ধ:

“তোমরা পাশ করে গেছ। বন্ধুত্ব ভাষায় নয়, হৃদয়ে হয়।”

বৃদ্ধ তাদের হাতে দিল পাঁচটি রুপালি পাতা। প্রত্যেক পাতার মধ্যে লেখা একটি করে শব্দ—

রাজু: সাহস

কাঠু: হাসি

ময়ূর: শান্তি

সোনা: সুর

বাজপাখি: দৃষ্টি

বৃদ্ধ:

“এই পাঁচটি গুণ— একসাথে থাকলে, তোমরা যে কোনো আঁধার জয় করতে পারবে।”

চাঁদের আলো ধীরে ধীরে ঝিমিয়ে এলো। তারা সবাই বুঝতে পারল, ফিরে যাওয়ার সময় হয়েছে।

বৃদ্ধ বললেন:

বৃদ্ধ:

“তোমাদের যাত্রা এখানেই শেষ নয়। জীবন মানে নতুন প্রশ্ন, আর বন্ধুত্ব মানে সেই প্রশ্নে একসাথে পথ চলা।”

ঘূর্ণির মতো এক আলো তাদের ঘিরে ধরল। তারা সবাই চোখ বন্ধ করে অনুভব করল— আকাশে এক অদৃশ্য সেতুতে হেঁটে তারা আবার ফিরে আসছে নিজের বনে।

রাজু চোখ খুলে দেখে তারা ফিরে এসেছে ঝর্ণার পাশে। আকাশে তারার ঝিকিমিকি, চারপাশে পাখির মৃদু সুর।

রাজু (চোখ মুছে):

“এটা কি স্বপ্ন ছিল?”

কাঠু (হেসে):

“স্বপ্নের মত হলেও, হাতে তো রুপালি পাতা আছে!”

সোনা (নরম গলায়):

“আমাদের বন্ধুত্ব এতটাই সত্যি যে চাঁদের আলোতেও পথ খুলে যায়।”

পরদিন বনের ছোট প্রাণীদের নিয়ে তারা আয়োজন করল এক ছোট উৎসব। সেখানে তারা চাঁদের উপত্যকার গল্প বলল।

সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনল। টিয়া দিদি ফিসফিস করে বলল:

“বন্ধুত্ব এমন এক আলো, যা শুধু চোখে নয়, হৃদয়েও পড়ে।”

২১. এক সকালে রাজু, কাঠু, সোনা, ময়ূর আর বাজপাখি বসে ছিল ঝর্ণার ধারে। আগের রাতের চাঁদের উপত্যকার গল্প এখনো সবার চোখে মুখে। হঠাৎ দূর থেকে ছোট্ট এক ছাগলছানা দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল:

ছাগলছানা:

“বড় বিপদ হয়ে গেছে! আমাদের বাগানের সব জীবনবীজ কেউ চুরি করে নিয়ে গেছে!”

রাজু (চমকে):

“জীবনবীজ? ওগুলো তো খুব দামী, খুব গুরুত্বপূর্ণ!”

ছাগলছানা (চোখ ভেজা করে):

“ওগুলো ছাড়া আমাদের গ্রামের ফসল জন্মাবে না…!”

সবার মন ভার হয়ে গেল।

কাঠু (জিজ্ঞেস করে):

“এই জীবনবীজ আসলে কী?”

সোনা (শিক্ষকের মতো):

“জীবনবীজ একধরনের জাদুকরী বীজ, যা প্রকৃতির আশীর্বাদে জন্মায়। যেখানেই পড়ুক, সেখানেই ফুল-ফল, ছায়া ও শান্তি আসে।”

ময়ূর:

“এগুলো চুরি যাওয়ার মানে হলো— প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাবে।”

রাজু:

“আমরা এই বীজ খুঁজে বের করব। যেভাবেই হোক।”

তারা ছাগলছানার গ্রামে গেল। সেখানে ছোটো বড়ো সবাই দুঃখী। রাজু চারপাশে খোঁজ শুরু করল। ঠিক তখন সোনা আঙুল তুলে বলল:

সোনা:

“ওই যে দেখো, বনের প্রাচীন রাস্তায় কালো একটা ছায়া দৌড়ে পালাচ্ছে!”

বাজপাখি সাথে সাথে উড়ে গেল, ময়ূরও ডেকে উঠল সতর্ক করে।

কাঠু গাছের গা বেয়ে দৌড়ে পালানো ছায়ার পিছু নিল।

রাজু:

“চলো, আমরা সবাই মিলে ছায়ার পথ ধরি।”

দীর্ঘ অনুসরণের পর তারা এসে পৌঁছায় এক গোপন গুহার মুখে। গুহার ভিতর থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এল—

গলা:

“আমি বীজ চুরি করিনি, শুধু নিয়ে এসেছি রক্ষা করতে!”

তারা গুহায় ঢুকে দেখল— একজন বয়স্ক খরগোশ, তার সামনে রাখা আছে জীবনবীজের থলি।

রাজু (রাগে):

“তুমি কেন এটা করেছো?”

বয়স্ক খরগোশ:

“শোনো ছেলে, আমি এই বীজ পেয়ে যাই। যখন বুঝি, এগুলো ছড়িয়ে পড়লে শুধু ফসল নয়, যুদ্ধও শুরু হতে পারে। অনেকে চায় এগুলো বিক্রি করতে, দামি করে তুলতে। আমি চাই সেগুলো নিরাপদে থাকুক।”

রাজু শান্ত কণ্ঠে বলল:

রাজু:

“আপনার ভয় সত্য। কিন্তু লুকিয়ে রাখলে সমস্যার সমাধান হয় না। সবাইকে নিয়ে আমরা মিলে একটা ব্যবস্থা করতে পারি।”

বয়স্ক খরগোশ:

“তোমরা কি আমাকে বিশ্বাস করবে?”

কাঠু (হেসে):

“আমরা বিশ্বাসে পথ চলি, সন্দেহে নয়।”

পরদিন রাজু ও তার বন্ধুরা ছাগলছানার গ্রামের সব প্রাণীদের ডেকে আনল। বয়স্ক খরগোশও এল।

রাজু বলল:

রাজু:

“চল আমরা একটা নিয়ম করি — জীবনবীজ কেবল তখনই ব্যবহার হবে, যখন প্রয়োজন সত্যি। কেউ একা একে রাখবে না, সবাই মিলে রক্ষা করবে।”

সবাই তালি দিয়ে সায় দিল।

একটা ছোট মাটির ঘর বানানো হলো, যেখানে বীজ থাকবে, আর প্রতি সপ্তাহে পালা করে প্রাণীরা পাহারা দেবে।

কয়েক সপ্তাহ পর সেই জীবনবীজ বপন করা হলো। মাঠে উঠে এলো রঙিন ফুল, ছোট ছোট ফলগাছ, আর সবুজের জাদু।

সোনা (আনন্দে):

“এটাই প্রকৃতির ভালোবাসা!”

বাজপাখি:

“তোমরা শুধু বীজ বাঁচাওনি, বরং বাঁচিয়েছো বন্ধন, বিশ্বাস আর সহমর্মিতা।”

সেই গ্রামের প্রাণীরা রাজু ও তার বন্ধুদের সম্মান জানাল। তাদের হাতে তুলে দিল এক ছোট্ট ফলকে লেখা স্মারক:

“যেখানে রাজু ও কাঠু আসে, সেখানে হাসি জন্মায়। বন্ধুত্ব যেখানে, জীবনবীজ সেখানেই।”

সেদিন রাতে তারা একসাথে বসে গান গাইল, আগুন জ্বালিয়ে গল্প বলল, আর আকাশের তারার নিচে প্রতিজ্ঞা করল—

“প্রতিদিন আমরা ভালোবাসা বুনব, ঠিক যেমন জীবনবীজ গাছ হয়ে দাঁড়ায়।”

২২. এক ভোরবেলা রাজু ঘুম থেকে উঠে দেখে কাঠু নেই। তার বিছানায় পড়ে আছে একটা ছোট্ট নোট:

“রাজু, আমি একটু নিজের মতো করে কিছু ভাবতে যাচ্ছি। ফিরে আসব… যদি পারি। — কাঠু।”

রাজু (চোখ বড় হয়ে):

“কাঠু কোথায় গেল? কেন একা চলে গেল?”

সোনা (উদ্বিগ্ন হয়ে):

“ও কি কোনো কষ্ট পেয়েছিল? আমরা তো কিছু বুঝতেই পারিনি!”

ময়ূর (শান্ত গলায়):

“কখনো কখনো খুব কাছের বন্ধুরা নিজের ভেতরের কষ্ট কাউকে বোঝাতে পারে না।”

রাজু দাদুর পুরনো মানচিত্র খুলে দেখল এক জায়গার নাম লেখা:

“অশ্রুর জঙ্গল – যেখানে হারিয়ে যাওয়া প্রাণীরা চলে যায়”

রাজু (নির্ভার গলায়):

“কাঠু ওখানেই গেছে। আমরা ওকে ফিরিয়ে আনব।”

অশ্রুর জঙ্গলে ঢুকতেই চারপাশ বদলে যেতে লাগল। গাছের পাতা থেকে পড়ছে জল, মাটি কাঁদা, বাতাসে কান্নার শব্দ।

সবাই নিঃশব্দে এগিয়ে চলল।

হঠাৎ এক গাছের ছায়া থেকে বেরিয়ে এলো এক ছোট্ট ভয়, নাম ছায়াবিন্দু।

ছায়াবিন্দু (গম্ভীর স্বরে):

“এই জঙ্গলে কেবল সেই প্রবেশ করতে পারে, যার মনে সত্যিকারের অনুশোচনা আছে।”

রাজু (স্পষ্ট গলায়):

“আমরা বন্ধু খুঁজতে এসেছি, তাকে বোঝাতে— সে একা নয়।”

ছায়াবিন্দু তাদের পথ ছেড়ে দিল।

অশ্রুর জঙ্গলের মাঝে একটা খোলা মাঠে কাঠু বসে আছে, একা। তার চারপাশে ঝরে পড়ছে কালো পাতার বৃষ্টি।

কাঠু (নিজের মনেই):

“আমি তো শুধু চাইছিলাম রাজুর মতো সাহসী হতে… কিন্তু আমি তো শুধু একটা ছোট কাঠবিড়ালি। কেউ যদি একদিন না চায় আমার বন্ধুত্ব, তাহলে?”

ঠিক তখনই রাজু আর তার বন্ধুরা এসে পৌঁছাল।

রাজু (চোখ ভেজা কণ্ঠে):

“তুই বুঝলি না কাঠু… তুই-ই আমার সাহস। আমি তোকে ছাড়া এক কদমও চলতে পারি না।”

কাঠু কিছু বলল না। শুধু ধীরে ধীরে উঠে এসে রাজুকে জড়িয়ে ধরল।

সেই মুহূর্তে অশ্রুর জঙ্গলে নেমে এলো এক উজ্জ্বল রোদ। চারপাশের কান্নার শব্দ থেমে গেল। পাতা থেকে পড়ল রুপালি জলবিন্দু— ঠিক যেন ক্ষমার বার্তা।

ময়ূর (নরম গলায়):

“কখনো কখনো কান্না আমাদের আরও কাছাকাছি আনে।”

সোনা:

“ভালোবাসা মানে শুধু একসাথে হাসা নয়, বরং যখন কেউ একা হয়ে পড়ে, তখন তাকে আবার জড়িয়ে ধরা।”

সেই বিকেলে তারা আবার ফিরে এল নিজেদের বনভূমিতে। সন্ধ্যার আগেই চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল কাঠুর ফিরে আসার খবর।

সবাই তাকে জড়িয়ে ধরল। পাখিরা গান গাইল, মধু আনল মৌমাছিরা, আর পুরনো বটগাছের নিচে সবাই মিলে বসে গল্প করল।

রাতে আগুন জ্বালিয়ে রাজু বলল:

রাজু:

“আমরা আর কখনো কাউকে একা হতে দেব না। কথা দাও সবাই— যদি কেউ একা চলে যেতে চায়, আমরা ওর হাত ধরি।”

সবাই একে একে হাত রাখল আগুনের পাশে, বলল একসঙ্গে:

“আমরা বন্ধু— একসাথে কান্না করব, একসাথে হাসব।”

পরদিন সকালে রাজু দেখে, কাঠুর ব্যাগে এক অদ্ভুত রুপালি পাথর। তাতে লেখা:

“যে কাঁদে অন্যের জন্য, সে সবচেয়ে সাহসী বন্ধু।”

২৩.  এক সকালে রাজুরা হঠাৎ দেখতে পেল এক নতুন প্রাণী বনভূমির দক্ষিণ সীমানায় বসে আছে। তার গায়ের রঙ গাঢ় ছায়ার মতো, চোখদুটি দীপ্ত, আর কণ্ঠস্বর নরম— নাম বলল “ছায়ামুখ”।

ছায়ামুখ:

“আমি বহু বন ঘুরে এসেছি। বন্ধু খুঁজছি— সত্যিকারের বন্ধু, যারা কথা রাখে, পাশে থাকে।”

রাজু ও তার বন্ধুরা একটু অবাক হলেও, সদয় হয়ে তাকে আমন্ত্রণ জানাল।

রাজু (হেসে):

“আমরা বন্ধু পেতে ভালোবাসি। এসো আমাদের সাথে থাকো।”

ছায়ামুখ প্রথমে অনেক সহযোগিতা করছিল— কাঠ কেটে দিচ্ছে, পাতা ঝাড়ছে, ছোট প্রাণীদের রক্ষা করছে। কিন্তু ধীরে ধীরে সবাই খেয়াল করল, তার কথায় একটা অদ্ভুত চাপ থাকে।

সোনা:

“ওর চোখে যেন… ভয় আছে, না কি লুকোনো কিছু?”

ময়ূর:

“ছায়া যতই সুন্দর হোক, সবসময় আলোকে ঢেকে রাখে।”

একদিন জীবনবীজের ঘর থেকে এক মুঠো বীজ হারিয়ে যায়। পাহারাদার খরগোশ জানায়— রাতের আঁধারে কেউ দরজার ছায়া পেরিয়ে ঢুকেছিল।

বাজপাখি (উড়তে উড়তে):

“আমি দেখতে পেয়েছিলাম এক ছায়ার মতো কিছু ঢুকেছিল ঘরে!”

সবাই ধীরে ধীরে ছায়ামুখের দিকে তাকাল।

ছায়ামুখ (চোখ নিচু করে):

“তোমরা ভাবছ আমি চুরি করেছি?”

কাঠু (কাঁপা গলায়):

“তুমি কি সত্যিই…?”

রাজু এক সভা ডাকল। সবাই হাজির।

রাজু:

“আমরা কাউকে দোষী করব না প্রমাণ ছাড়া। কিন্তু আমাদের বীজ ফেরত চাই। যদি সত্যিই কেউ ভুল করেছে, সে যদি স্বীকার করে, আমরা ক্ষমা করব।”

ছায়ামুখ চুপ।

ছোট পেঁচা ফিসফিস করে:

“ছায়ার মধ্যে যদি ভালোবাসা থাকে, তবে আলো আবার জ্বলে উঠবে।”

ঠিক তখন ছায়ামুখ এগিয়ে এল।

ছায়ামুখ (অশ্রুসিক্ত চোখে):

“হ্যাঁ, আমি নিয়েছিলাম। আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম— ভাবলাম তোমরা একদিন আমায় ফেলে দেবে। আমি সেই বীজ লুকিয়ে রেখেছিলাম যেন দরকারে নিজের জন্য কিছু করতে পারি।”

সোনা (শান্ত কণ্ঠে):

“তুমি যে ভয় পেয়েছিলে, সেটা বোঝা যায়। কিন্তু বন্ধুত্ব ভয় দিয়ে টেকে না, বিশ্বাস দিয়ে টেকে।”

রাজু (হাত বাড়িয়ে):

“তুমি যদি সত্যিই ফিরে পেতে চাও আমাদের বন্ধুত্ব, তাহলে চল — বীজ ফেরত দাও আর আমরা শুরু করি নতুন করে।”

ছায়ামুখ কাঁদতে কাঁদতে এগিয়ে গিয়ে বীজ ফেরত দিল।

তখনই এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটল— ছায়ামুখের গায়ের গাঢ় রঙ ফিকে হতে লাগল। সে ধীরে ধীরে পরিণত হল এক আলোছায়ার মিশ্র রূপে, যার মধ্যে ভয় আর ভালোবাসা পাশাপাশি থাকে।

বাজপাখি:

“তোমার ছায়া এখন আর ভয় নয়— বরং তুমি নিজেই নিজেকে আলোর পথে আনলে।”

সেদিন সন্ধ্যাবেলায় সবাই একসাথে বসে প্রতিজ্ঞা করল:

কেউ যদি ভুল করে, তাকে বোঝাব।

কেউ যদি একা হয়ে যায়, তাকে জড়িয়ে ধরব।

কেউ যদি ভয় পায়, তাকে আশ্বাস দেব।

রাজু (চোখ তুলে):

“বন্ধুত্ব মানে হলো— ভুল করলেও পাশে থাকি, যদি সে ফিরে আসতে চায়।”

পরদিন ছায়ামুখ বলল:

“আমি আর সেই পুরনো ছায়ামুখ নই। তোমরা কি আমায় নতুন নাম দেবে?”

কাঠু (চিন্তাভাবনা করে):

“তোমার নতুন নাম হোক… ‘আলোকছায়া’।”

সবাই সায় দিল।

২৪.  সকালবেলায় রাজু ও তার বন্ধুরা যখন বনের প্রান্তে খেলছিল, হঠাৎ আকাশে এক অদ্ভুত কালো মেঘ জমতে শুরু করল। গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি ছুঁয়ে যাচ্ছিল মাটিকে, তারপর হঠাৎ প্রচণ্ড গর্জন—

বজ্রাংগ গর্জন!

সোনা (চমকে উঠে):

“এই শব্দটা সাধারণ না… এটা তো বজ্রপুরীর ডাক!”

আলোকছায়া (চোখ বড় করে):

“বজ্রপুরী মানে মেঘদেবী মেরুশক্তির প্রাসাদ থেকে নেমে আসছেন! তিনি সাধারণত রেগে গেলে গোটা বন ঝলসে দিতে পারেন!”

কয়েক মুহূর্ত পরেই আকাশ চিরে নেমে এল এক উজ্জ্বল নীলাভ রশ্মি। সেই রশ্মির ভেতর দাঁড়িয়ে এক মহিমান্বিতা নারীর অবয়ব — মেঘদেবী বজ্রপুরী। তাঁর মাথায় ছিল বজ্রপালঙ্ক, কণ্ঠে মেঘমালিকা, আর চোখে ঝলকানি।

বজ্রপুরী (বিকট কণ্ঠে):

“পৃথিবীর এই অংশে ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে! কেউ একজন মেঘের পাথর চুরি করেছে! তার কারণে বর্ষার নিয়ম ভেঙে যাচ্ছে!”

রাজু (অবাক হয়ে):

“মেঘের পাথর? আমরা তো এমন কিছু জানিই না!”

মেঘদেবী সময় দিলেন মাত্র ৩ দিন— তার মধ্যে মেঘের পাথর ফেরত দিতে হবে। না হলে তিনটি মৌসুম একসাথে ঝরে পড়বে: বৃষ্টি, শীত আর খরা!

কাঠু (ঘাবড়ে):

“তাহলে আমাদের গাছ, পশু, খাবার সব শেষ হয়ে যাবে!”

রাজু সিদ্ধান্ত নিল— যেভাবেই হোক, এই পাথর খুঁজে বের করতে হবে।

সন্ধ্যার দিকে আলোকছায়া ধীরে ধীরে বলল—

আলোকছায়া:

“আমি জানি এক জায়গা, যেখানে হয়তো এটা লুকিয়ে রাখা হতে পারে— পুরোনো বজ্রগুহা। ওটা খুব বিপজ্জনক, কিন্তু আমি তোমাদের নিয়ে যেতে পারি।”

রাজু (নরম গলায়):

“তুমি কি ওখানে আগে গিয়েছিলে?”

আলোকছায়া চোখ নামিয়ে বলল:

“হ্যাঁ… একসময় আমি নিজেও ভয় পেতাম, তাই একটা ছোট পাথর কুড়িয়ে রেখেছিলাম। তখন বুঝিনি ওটাই মেঘের পাথর।”

পরদিন তারা রওনা দিল বজ্রগুহার পথে। সেই পথ কেবল মেঘমালার ভেতর দিয়ে যায়— অর্থাৎ, একপ্রকার আকাশের ঢেউয়ের মধ্যে দিয়ে চলতে হয়। সোনা আর বাজপাখি বাতাসে উড়ে পথ দেখাতে লাগল, কাঠু ঝোপ কেটে এগিয়ে চলল, আর রাজু এক হাতে আলোকছায়ার হাত ধরে রাখল।

ময়ূর (গান গাইতে গাইতে):

“ভয় পেলে থেমো না, ভয় ভাঙাও আলো দিয়ে…”

গুহার ভেতর অদ্ভুত শব্দ— কখনো কারো কান্না, কখনো আবার গর্জন। হঠাৎ একটা ছায়া ভেসে এল — তীব্র, কালো, নির্জনতা।

ছায়া বলল:

“তোমরা কি পাথর নিতে এসেছো? এখানে শুধু সাহসীরা প্রবেশ করে!”

রাজু সামনে গিয়ে বলল:

“আমরা চুরি করতে আসিনি, ফিরিয়ে দিতে এসেছি। প্রকৃতি আমাদের ভালোবাসে, আমরা সেই ভালোবাসা ফিরিয়ে দিতে এসেছি।”

ছায়া মিলিয়ে গেল। সামনে খুলে গেল একটা পাথরের কক্ষ, যেখানে এক কাচের পাত্রে রাখা নীলাভ জ্বলন্ত পাথর — মেঘের পাথর!

তারা পাথর নিয়ে ফিরে এলো বনে। তখন সময় মাত্র এক ঘণ্টা বাকি। চারদিক কাঁপছে, মেঘ ঝাঁপিয়ে পড়ছে গাছের উপর।

রাজু বজ্রপুরীর সামনে পাথর এগিয়ে দিল।

রাজু:

“আমরা ভুল বুঝেছিলাম। আলোকছায়া এটা না জানিয়ে নিজের কাছে রেখেছিল, কিন্তু এখন সে বুঝেছে।”

বজ্রপুরী (নরম হয়ে):

“আলোকছায়া, তুমি কি বুঝতে পেরেছ সত্যিকারের শক্তি কী?”

আলোকছায়া (মাথা নিচু করে):

“শক্তি মানে ভয় নয়, শক্তি মানে দায়িত্ব।”

মেঘদেবী পাথর হাতে নিয়ে হাসলেন। আকাশের গর্জন থেমে গেল। শুরু হলো এক মিষ্টি বৃষ্টি— যা ছিল শান্তি ও ক্ষমার বার্তা।

বজ্রপুরী:

“তোমরা আজ প্রমাণ করেছ, আলো-ছায়া একসঙ্গে থাকলে প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় থাকে।”

তারপর তিনি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেলেন আকাশে।

সেদিন বিকেলে বনের প্রাণীরা মিলে তৈরি করল একটি নতুন পতাকা—

“মেঘপতাকা”, যার রঙ ছিল সাদা, নীল ও ছায়া মিশ্র ধূসর।

তাতে লেখা ছিল—

“ভুল হতেই পারে, কিন্তু ভালোবাসা দিয়ে তা শুধরে নিলে প্রকৃতি নিজেই আশীর্বাদ দেয়।”

২৫. এক বিকেলবেলা রাজু আর কাঠু বড় গাছের নিচে বিশ্রাম নিচ্ছিল। হঠাৎ তারা দেখতে পেল এক অদ্ভুত পাখি— ডানা ঘড়ির কাঁটার মতো ঘোরে, চোখে চশমা, আর ঠোঁটে ধরে রেখেছে একটা ছোট্ট কাগজের রোল।

পাখিটি নেমে এসে কাগজটি রাজুর দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলল:

ডাকপাখি:

“দ্রুত যাও ঘুমহীন গ্রামে। সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে। বাচ্চারা ঘুমাতে পারছে না!”

কাঠু (ভ্রু কুঁচকে):

“বাচ্চারা ঘুমাতে পারছে না? মানে কী?”

রাজু (কাগজ খুলে পড়ে):

“আমরা ক্লান্ত… কিন্তু চোখ বন্ধ করলেই ভয় এসে চেপে ধরে। স্বপ্ন হারিয়ে গেছে। রাজু, দয়া করে এসো। — ঘুমহীন গ্রামের শিশুরা।”

রাজু, কাঠু, সোনা, বাজপাখি, আলোকছায়া, আর ময়ূর সবাই রওনা দিল। তারা পেরিয়ে গেল গর্জনশালার পাহাড়, শিমুলবনের নদী, শেষে পৌঁছাল এক অদ্ভুত গ্রামে— সবকিছু থেমে আছে, বাতাস নেই, পাখির গান নেই।

আর সবচেয়ে অবাক করা বিষয়— গ্রামের সবাই জেগে আছে, কেউ চোখ বন্ধ করে না।

এক শিশু (চোখ লাল করে):

“চোখ বন্ধ করলেই দুঃস্বপ্ন আসে। ভয়ঙ্কর ছায়া এসে বলে— ‘তোমরা একা’।”

রাজু:

“কিন্তু দুঃস্বপ্ন তো বাস্তব নয়! তাহলে কেন সবাই এত ভয় পাচ্ছে?”

বৃদ্ধ কচ্ছপ:

“এটা সাধারণ দুঃস্বপ্ন নয়… এটা ছায়ামায়া নামক এক অভিশাপ!”

আলোকছায়া (চিন্তিত গলায়):

“ছায়ামায়া… আমি শুনেছি তার নাম। সে এক পুরনো ছায়াজীব, যে মানুষের ভয় থেকে শক্তি পায়। সে শিশুদের স্বপ্ন চুরি করে রাতের আকাশে ঝুলিয়ে রাখে, যাতে তারা ঘুমাতে না পারে।”

রাজু:

“তাহলে আমাদের সেই স্বপ্নগুলো খুঁজে পেতে হবে, ফিরিয়ে আনতে হবে।”

সেই রাতে রাজু ও তার বন্ধুরা মিলে এক জাদুকরী গান গাইল, যেটা তাদের স্বপ্নের জগতে প্রবেশ করাতে পারে।

ময়ূর (গভীর সুরে):

“ঘুমের দরজা খোলো হে তারা,

ভয়ের অন্ধকার করো সারা…”

হঠাৎ চারপাশে আলো কমে গেল, আর তারা প্রবেশ করল এক অন্য জগতে— স্বপ্ন-জাল।

এই জগতে সবকিছু অস্থির। গাছগুলো উল্টো, নদী আকাশে ভেসে বেড়ায়। এখানে রাজুদের চারপাশে ছায়া ঘুরপাক খাচ্ছে— শীতল, ভারি, অন্ধকার।

কাঠু:

“দেখো, ওই তো ছোট্ট শিশুদের স্বপ্ন— উড়ন্ত হেলিকপ্টার, চকোলেট গাছ, রংধনু হরিণ!”

তবে তাদের আগেই ছুটে এল ছায়ামায়া— ভয়াবহ এক ছায়া-দানব, যার চোখ দুইটা যেন অন্ধকার রাতের কেন্দ্র।

ছায়ামায়া (গর্জে):

“তোমরা আমার খাবার নিতে এসেছো? আমি ভয়ের মালিক! কেউ আমার কাছ থেকে স্বপ্ন নিয়ে যেতে পারবে না!”

রাজু সামনে এগিয়ে এসে বলল:

“তুমি ভয় পেলে বড় হও, আমরা ভালোবাসলে— এক হই। ভয় ভেঙে আমরা স্বপ্ন ফিরিয়ে আনব।”

তারা একসাথে দাঁড়িয়ে গাইল—

“ভয় নয়, আলো চাই,

মায়া নয়, ভালো চাই!”

তৎক্ষণাৎ এক উজ্জ্বল রশ্মি ছায়ামায়াকে ঘিরে ফেলল। ধীরে ধীরে তার অন্ধকার গলতে লাগল… আর সে নিঃশব্দে মিশে গেল বাতাসে।

শিশুদের রঙিন স্বপ্নগুলো হাওয়ায় ভেসে ফিরে এল— কেউ চাঁদের ওপর দোলনা দিচ্ছে, কেউ দাদুর সঙ্গে গল্প করছে, কেউ আবার রাজু আর কাঠুর সঙ্গে খেলছে।

রাজুরা ঘুমহীন গ্রামে ফিরে এসে দেখল— শিশুরা হেসে হেসে ঘুমিয়ে পড়ছে।

এক মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন:

“তোমরা আমাদের সন্তানদের ঘুম ফিরিয়ে দিয়েছো… এ ঋণ কোনোদিন শোধ হবে না।”

গ্রামের শিশুরা মিলে রাজুদের উপহার দিল এক ব্যতিক্রমী বীজ— স্বপ্নবীজ।

“এই বীজ যেখানে বপন করবে, সেখানে দুঃস্বপ্ন ঢুকতে পারবে না।”

রাজু সেই বীজ নিল, বলল:

“আমরা এই বীজ ছড়িয়ে দেব পুরো বনে— যেন আর কোনো শিশু দুঃস্বপ্নে ভয় না পায়।”

২৬. একদিন রাজু ও কাঠু বড় বাঁশবনের ভেতর খেলা করতে করতে দেখতে পেল মাটির নিচ থেকে একটু ধাতব অংশ উঁকি মারছে।

রাজু (কৌতূহল নিয়ে):

“এটা কী? এমন ধাতব জিনিস তো আমাদের বনে নেই!”

তারা সাবধানে মাটি খুঁড়তে শুরু করল। একসময় বের হয়ে এলো একটি পুরনো কাঠের বাক্স, যার ভিতরে ছিল এক পুরোনো রত্নখচিত ঘড়ি।

কাঠু:

“ঘড়ি তো আমরা অনেক দেখেছি, কিন্তু এই ঘড়ির কাটাগুলো তো উল্টো দিকে ঘোরে!”

ঘড়িটির সাথে একটি ভাজ করা চিঠি ছিল, যেটি লিখে গেছেন “প্রাচীন সময়রক্ষক” নামের এক চরিত্র।

“এই ঘড়ির মাধ্যমে সময়ের প্রবাহে ভ্রমণ করা যায়। তবে সাবধান, সময়ের ধারে দাঁড়িয়ে ভুল সিদ্ধান্ত পুরো বনকে উল্টে দিতে পারে।”

সোনা (চোখ বড় করে):

“তাহলে… এটা কি টাইম মেশিন?”

রাজু ও তার বন্ধুরা সিদ্ধান্ত নিল ঘড়িটি একবার ব্যবহার করবে— বুঝে নেওয়ার জন্য। সবাই ঘড়ির কাটায় একসাথে স্পর্শ করল।

হঠাৎ করেই চারপাশে সবকিছু ঘুরে উঠল, বাতাস থেমে গেল, পাখির ডাক নিঃশব্দ হয়ে গেল। চোখের সামনে খুলে গেল এক অন্য সময়ের দরজা।

তারা এসে পৌঁছায় ৫০ বছর আগের বনভূমিতে। তখনো পাকা রাস্তা হয়নি, গাছের সংখ্যা বেশি, আর প্রাণীদের ভাষা একেবারে ভিন্ন রকম।

তারা দেখতে পেল ছোট্ট এক রাজু, যার হাত ধরে হাঁটছে তার দাদু— ঠিক সেই সময়, যখন রাজুর দাদু বনের রক্ষক ছিলেন।

কাঠু (নিঃশব্দে):

“ওই তো রাজুর দাদু… তিনি যে এই বনের শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন!”

হঠাৎ তারা দেখতে পেল— কিছু বহিরাগত শিয়াল বনদখলের চেষ্টা করছে। কিন্তু দাদু তাদের সঙ্গে বোঝাপড়া করে বনকে বাঁচিয়েছিলেন।

রাজু মনে মনে ভাবল— যদি সে এখন কিছু পরিবর্তন করে, হয়তো ভবিষ্যৎ আরও ভালো হবে।

আলোকছায়া (সতর্ক করে):

“না রাজু, সময়কে বদলালে স্মৃতি বদলে যায়। তুমি নিজেকেই হারাতে পারো!”

রাজু দ্বিধা নিয়ে কিছুই করল না। তারা ঘড়ির কাটায় আবার স্পর্শ করল।

এইবার তারা পৌঁছাল ভবিষ্যতের বনভূমিতে— ৫০ বছর পর। সেখানে তারা দেখতে পেল বন অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর, কিন্তু প্রাণীদের চোখে তৃপ্তি নেই, হাসি নেই।

সোনা:

“সব আছে… কিন্তু ভালোবাসা নেই।”

ময়ূর (আত্মস্থ কণ্ঠে):

“তাহলে কি উন্নয়ন মানেই সুখ নয়?”

এক বৃদ্ধ কাঠবিড়ালি এসে রাজুকে বলল:

“তুমি সেই রাজু, যার দাদা সময়ঘড়ি ফিরিয়ে এনেছিল। তুমি যদি ভালোবাসা ভুলে যাও, তবে বনও হারায় নিজের হৃদয়। ফিরে যাও, মনে রাখো— উন্নয়ন নয়, সুরক্ষা জরুরি।”

তারা ঘড়ির কাটায় আবার স্পর্শ করল। এবার তারা ফিরে এল বর্তমানের বনে।

সেই পুরোনো ঘড়ি আবার বাক্সে ভরে রেখে দিল তারা, এবং চারদিকে ছড়িয়ে দিল এক নতুন বার্তা:

“ভবিষ্যৎ গড়ে তুলি আমরা, কিন্তু অতীতের শিক্ষা ভুলে গেলে সে ভবিষ্যৎ হবে ফাঁকা।”

বনের কেন্দ্রে রোপণ করা হল এক বিশেষ গাছ— “ঘড়িগাছ”, যার পাতাগুলো সূর্যের আলোয় চকচক করে। প্রতিটি পাতা যেন সময়ের প্রতীক।

রাজু (গম্ভীর গলায়):

“যখন কেউ আবার সময় নিয়ে খেলতে চাইবে, সে যেন প্রথমে এই পাতার নিচে বসে কিছুক্ষণ ভাবার সময় পায়।”

২৭. সময় ঘড়ির অভিযানের পরদিন সকালে রাজুরা খেয়াল করল— সোনা নেই!

আলোকছায়া (চোখ কুঁচকে):

“ও তো গতকাল আমাদের সঙ্গে ছিল! রাতে একই জায়গায় ঘুমিয়েছিল!”

রাজু চারপাশ খুঁজে দেখে, যেখানে সোনা ঘুমিয়েছিল, সেখানে পড়ে আছে তার গলায় পরা পাতার মালা— তবে তাতে সময়ঘড়ির মতো এক অদ্ভুত আভা!

রাজু (কান্না চেপে):

“সোনা হয়তো সময়ঘড়ির ছায়ায় হারিয়ে গেছে!”

রাজুদের পুরোনো ময়ূরদাদা জানাল—

“যদি সময় কোনো প্রাণীকে নিঃশব্দে ধরে ফেলে, তবে সে চলে যায় ‘স্মৃতির গুহা’-য়, যেখানে তার অস্তিত্ব জমে থাকে স্মৃতির রূপে।”

তারা রওনা দিল স্মৃতির গুহার খোঁজে— পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে, পুরোনো বাতাসে ভেসে থাকা দীর্ঘশ্বাস মাড়িয়ে।

গুহার দেয়ালে ছিল সবার পুরোনো স্মৃতির প্রতিচ্ছবি— হাসি, কান্না, ভয়, দুঃখ। এক দেয়ালে সোনাকে দেখা গেল— একা বসে আছে, কিন্তু তাকাচ্ছে না তাদের দিকে।

রাজু চিৎকার করল—

“সোনা! আমরা এসেছি! তুমি একা নও!”

কিন্তু সোনা কিছুমাত্র সাড়া দিল না। গুহার প্রবেশপথে লেখা—

“যে তার অতীত ভুলতে চায়, সে ফিরে যেতে পারে না।”

আলোকছায়া:

“আমরা বুঝিনি, সোনার ভেতরে এমন কিছু লুকিয়ে ছিল…”

তারা দেখতে পেল সোনার স্মৃতির মধ্যে এক ভয়াবহ ছবি— ছোটবেলায় সে এক দুর্ঘটনায় তার মা-বাবাকে হারিয়েছিল। সেই দুঃখ, সেই অনুতাপ, সে কাউকে জানায়নি।

কাঠু (চোখ ভিজে):

“সে সবসময় আমাদের হাসিয়েছে, আর নিজের কান্না গোপন রেখেছে?”

রাজু (চোখ নামিয়ে):

“এই তো আসল বন্ধুতা— আমরা তার কান্না দেখতে পাইনি, ভুলটা আমাদেরই।”

গুহার এক দরজায় লেখা:

“স্মৃতি পাল্টাতে চেয়ো না। বরং তাকে জড়িয়ে ধরো।”

রাজু ও কাঠু মিলে সোনার সামনে গিয়ে বসে পড়ল। তারা কিছু বলেনি, শুধু তার পাশে থেকেছে।

একসময় সোনা কাঁদতে কাঁদতে বলল—

“তোমরা চলে যাবে না তো? আমিও তো হারিয়েছিলাম সবাইকে একদিন…”

রাজু (হাত ধরে):

“তুমি কাউকে হারাওনি, আমরা তো তোমারই আছি।”

সেই মুহূর্তে গুহার দেয়ালে ফাটল ধরল। এক উজ্জ্বল আলোর রেখা চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল। গুহা ভেঙে পড়ল না, বরং খুলে গেল এক ফেরার পথ।

সোনা চোখ তুলে বলল—

“আমি ফিরতে চাই… নিজের ভেতরের আলো নিয়ে।”

তারা সবাই একসঙ্গে সেই আলোপথ ধরে ফিরে এলো নিজের বনে।

ফেরার পথে তারা খেয়াল করল— গলায় থাকা পাতার মালা নতুন এক রঙ নিয়েছে। সেই রঙ স্মৃতির, কান্নার, আবার নতুন শুরুয়াতের।

রাজু বলল—

“ভুল ছিল আমাদের— আমরা শুধু হাসি খুঁজে গেছি, কান্নার ভেতরের বন্ধুটাকে চিনিনি।”

তারা গাছতলায় একটা বিশেষ জায়গায় লাগাল “স্মৃতিফুলের বীজ”— যার ফুল হবে কেবল তখনই, যখন কেউ সত্য করে তার পুরনো দুঃখ শেয়ার করে।

সোনা (হেসে):

“এ ফুল যারা দেখবে, তারা বুঝবে— কান্না মানে দুর্বলতা নয়, বরং বন্ধুদের সঙ্গে কান্না মানে সাহস।”

২৮. স্মৃতিফুল গাছের চারপাশে এক শান্ত পরিবেশ। শিশুরা আসে, বসে থাকে, চোখ বন্ধ করে নিজেদের কষ্টের কথা বলে— ফুল ফোটে, হালকা আলো জ্বলে ওঠে।

এক রাতে রাজু খেয়াল করল— ফুলগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। আলো নিভে যাচ্ছে।

সোনা (চিন্তিত গলায়):

“কেউ কি… আমাদের স্মৃতিগুলো চুরি করছে?”

পরদিন সকালে রাজুরা দেখতে পেল বনের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে এক নতুন প্রাণী— লম্বা কোট পরে, মুখ ঢেকে রেখেছে, চলাফেরা একদম শব্দহীন।

কাঠু (ফিসফিসিয়ে):

“ওর পায়ের নিচে পাতাও কাঁপছে না!”

আলোকছায়া তার নাম জানে— “মরিচীকা”। এক সময়ের বনবাসী, যে এখন স্মৃতি শিকার করে। তার কাজ, মানুষের কষ্ট বা দুঃখ চুরি করে নিজের সংগ্রহে রাখা। তার যুক্তি—

“যদি কেউ কষ্ট মনে না রাখে, সে কষ্ট আর থাকে না।”

স্মৃতিফুলের গাছ থেকে একদিন বেরিয়ে এল এক নরম আলো। তার ভেতর থেকে শোনা গেল এক কণ্ঠ—

“যে স্মৃতি তুমি চুরি করো, সে কেবল দুঃখ নয়, তার সঙ্গে ভালোবাসাও থাকে। ভুলে গেলে মানুষ মানুষ থাকে না।”

মরিচীকা হেসে বলে—

“ভালোবাসা ছেলেমানুষি কথা। আমি শুধু নীরবতা চাই, যন্ত্রণাহীনতা চাই।”

রাজু সিদ্ধান্ত নেয়, তাকে রুখতে হবে। কিন্তু সরাসরি লড়াই নয়— স্মৃতি দিয়ে, আবেগ দিয়ে, বন্ধুত্ব দিয়ে। সবাই মিলে তৈরি করে “স্মৃতিশিখা”— এক বিশেষ আলো যা সত্যিকারের স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলে।

ময়ূর:

“মরিচীকা মানুষের কষ্ট চুরি করে, কিন্তু সে চুরি করতে পারবে না একসঙ্গে ভাগ করে নেওয়া স্মৃতি!”

রাতে মরিচীকা স্মৃতিগাছের দিকে এগিয়ে আসে। কিন্তু রাজু, সোনা, কাঠু, আলোকছায়া দাঁড়িয়ে যায় তার সামনে।

রাজু (দৃঢ়ভাবে):

“তুমি যদি সত্যিই শান্তি চাও, তবে বোঝো— কষ্ট ভুলে গেলে মানুষ কেবল ফাঁকা হয়ে যায়।”

মরিচীকা:

“তোমরা বোঝো না… আমি নিজেও স্মৃতি ভুলতে চাই! আমার হারানো পরিবার, আমার ফেলে আসা সময়, আমার কান্না— আমি সব ভুলতে চেয়েছিলাম…”

এই প্রথমবার, মরিচীকার চোখে জল দেখা গেল। তার কণ্ঠ কাঁপে।

সোনা (নরমভাবে):

“তোমার কান্নার জায়গা আমরা দেব। আমাদের মধ্যেও থাকবে তোমার স্মৃতির গাছ। তুমি একা নও।”

স্মৃতিশিখা থেকে আলো ছড়িয়ে পড়ে তার গায়ে। কোট খুলে পড়ে যায়— ভেতরে দেখা গেল এক বৃদ্ধ খরগোশ, একসময় বনের প্রাচীন ইতিহাসবিদ, যিনি নিজের কষ্ট লুকিয়ে হারিয়ে গিয়েছিলেন।

রাজুরা সিদ্ধান্ত নেয়, স্মৃতিফুলগাছের নতুন নাম হবে—

“সহমর্মিতার বৃক্ষ”।

যেখানে কেউ চাইলে গিয়ে নিজের গল্প বলতে পারবে, শুধু কষ্ট নয়, আনন্দও।

আলোকছায়া:

“ভবিষ্যতের বাচ্চারা যেন জানে— কেউ একা কাঁদে না, কেউ একা হাসেও না।”

মরিচীকা রাজুকে দিয়ে যায় একটি প্রাচীন খাম—

তাতে লেখা ছিল এক গোপন মানচিত্র… ভবিষ্যতের বিপদের পূর্বাভাস, যা বলা হয়:

“যেখানে কান্না থেমে যায়, সেখানেই জন্ম নেয় ভয়ঙ্কর নিরবতা।”

রাজু তা লুকিয়ে রাখে, এবং ভাবে— এই মানচিত্রের রহস্য উদঘাটনই হবে তাদের পরবর্তী অভিযানের পথ।

২৯. মরিচীকা রাজুকে দিয়েছিল এক পুরনো মানচিত্র, যার কাগজ ছিল রূপার মতো চকচকে, আর লিখা ছিল অদ্ভুত এক ভাষায়— যেটা কেবল চাঁদের আলোয় দৃশ্যমান।

আলোকছায়া (দেয়ালের ছায়ায় খেয়াল করে):

“এই তো— চাঁদের আলোয় একবারে দেখা যাচ্ছে একটা পথ… ‘নীরব ভূমি’র দিকে।”

কাঠু:

“ওই পথ দিয়ে কাউকে যেতে দেখিনি কখনো…”

রাজু:

“সেখানেই হয়তো ‘ভয়ঙ্কর নিরবতা’ জন্ম নিয়েছে… আমাদের বনের ভবিষ্যৎ জানার একমাত্র উপায় এটা।”

তারা মানচিত্র অনুসরণ করে এক অজানা বনের দিকে রওনা দেয়। কিছুদূর যেতেই আশ্চর্য ঘটনা ঘটে— চারপাশের শব্দ একদম মিলিয়ে যায়।

পাতা পড়ে কিন্তু আওয়াজ নেই, নদী বইছে কিন্তু শব্দ নেই, এমনকি নিজেদের মুখ দিয়ে কিছু বলতেও পারছে না!

সোনা (চোখ ইশারায়):

“আমরা… কথা বলতে পারছি না?”

সঙ্গে থাকা পাখিরা পর্যন্ত নির্বাক।

তারা তখন বোঝে— এই বনে কথা বলার একমাত্র উপায় ইশারার ভাষা।

রাজুদের দল কাগজে ছবি আঁকে, চিহ্ন বানায়, হাত দিয়ে ইশারা করে— তারা যেন এক নতুন ভাষায় কথা বলতে শিখে নিচ্ছে।

আলোকছায়া লিখে দেয়:

“এই বনে কথা নয়, বোঝা জরুরি। হৃদয়ের ভাষা শব্দ ছাড়াও পৌঁছে যায়।”

মানচিত্রে দেখা যায় এক প্রাচীন পাহাড়— “ধ্বনিগুহা” নামে পরিচিত। শোনা যায়, এই গুহার মধ্যে পৃথিবীর সব শব্দ আটকে আছে। শব্দ চুরি করে কেউ রেখে দিয়েছে সেখানে।।

তারা প্রবেশ করে সেই গুহায়— ভিতরে গিয়ে শুনতে পায় নিজেদের পুরনো শব্দ…

রাজু: তার মা’র গল্প বলা কণ্ঠ

সোনা: তার ছোটবেলার গান

কাঠু: বনের পাতার খসখস

শব্দ গায়ে এসে জড়িয়ে পড়ে। সবার চোখ ভিজে যায়।

গুহার গভীরে হঠাৎ দেখা দেয় এক ছায়ামূর্তি— নাম “শব্দচোর”, একসময়কার চিত্রলিপি রক্ষক, যে বিশ্বাস করত, শব্দ থেকে কেবল যুদ্ধ জন্মায়।

শব্দচোর (নীরবভাবে লিখে):

“তোমরা যত কথা বলো, তত ভুল করো। আমি তাই শব্দ আটকে রাখি।”

রাজু (ইশারায়):

“কিন্তু শব্দ মানে শুধু যুদ্ধ নয়, শব্দ মানে গান, গল্প, ভালোবাসাও।”

রাজুরা গুহার ভিতর নিজেদের হৃদয়ের শব্দ গুছিয়ে বানায় একটি “নিঃশব্দ গান” — কেউ উচ্চারণ করে না, কিন্তু চোখে চোখে, হৃদয়ে হৃদয়ে সেই সুর ভেসে ওঠে।

শব্দচোর সেই সুরে কাঁপতে থাকে, ভেঙে পড়ে।

শব্দচোর (নম্রভাবে মাথা নিচু করে):

“আমি ভুল করেছিলাম। কষ্ট থেকে পালিয়ে শব্দ বন্দি করেছিলাম। এখন আমি আবার শব্দকে মুক্ত করব।”

গুহা ফেটে পড়ে এক উজ্জ্বল আলোয়। হঠাৎ চারপাশে সব শব্দ ফিরে আসে— নদীর স্রোত, পাতার সুর, প্রাণীদের ডাকে বন আবার জেগে ওঠে।

সোনা (হেসে চেঁচায়):

“আমি আবার কথা বলতে পারছি!

রাজুরা গুহার পাশে গাছ লাগায়— “শব্দবৃক্ষ”, যার পাতা ঝরলে একটা গল্প বলে। সেই গাছের নিচে লেখা হয়:

“শব্দ না থাকলে, হৃদয়ও থেমে যায়।

ভাষা মানে জীবনের চলাচল।”

৩০. রাজু, সোনা, কাঠু, আলোকছায়া, ময়ূর— সবাই ফিরে আসে বনের কেন্দ্রে। চারপাশে আবার জীবন জেগেছে। গাছেরা হাসছে, পাখিরা গান গাইছে, শিশুরা আবার আগের মতো দৌড়াদৌড়ি করছে।

রাজু (বসে পড়ে):

“এত কিছু হয়ে গেল… যেন একটা জীবন পার করে এলাম।”

কাঠু (হাসতে হাসতে):

“আমরা শুধু ঘুরতে বের হয়েছিলাম, তাই না?”

স্মৃতিফুলের নিচে বসে সবাই মিলে একেকটি চিঠি লেখে নিজেদের ছোটবেলার নিজেকে।

চিঠির শুরু হয়:

“প্রিয় আমি…”

সোনা লিখে:

“ভেবেছিলাম একা থাকলেই কষ্ট কমে যায়। এখন জানি, একা থাকলে কষ্ট আরও গভীর হয়। বন্ধুদের পাশে রাখা মানেই শক্তি পাওয়া।”

আলোকছায়া লেখে:

“আমি শুধু ছায়া ছিলাম। এখন আলোতেও থাকি— কারণ কেউ বিশ্বাস করেছে।”

সবাই মিলে আয়োজন করে এক নাটক: “আমাদের যাত্রা”।

সেই নাটকে উঠে আসে:

দুঃস্বপ্নের ভয়

সময়ের ঘড়ি

মরিচীকার কান্না

শব্দচোরের মুক্তি

পুরো বনভূমির প্রাণীরা জড়ো হয়, দেখে এক শিশুর মতো রাজুরা কীভাবে নিজেদের গড়ে তুলেছে।

নাটকের শেষে রাজু বলে—

“আজ থেকে আমরা সবাই বন্ধু। কেউ একা নয়। কেউ নিঃশব্দ নয়। যে কাঁদবে, সে পাশে কাউকে পাবে।”

সেই রাতে সবাই মিলে হাতে রাখে এক একটি পাতা— স্মৃতিফুল, শব্দবৃক্ষ, সময়ঘড়ি ও সহমর্মিতার প্রতীক।

হঠাৎ দেখা যায়, ছায়ামায়া নামের সেই পুরোনো ছায়া জঙ্গলের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে।

কিন্তু এবার সে আগের মতো ভয়ানক নয়— সে ধীরে ধীরে এসে বলে—

“তোমরা ভয়কে বন্ধুত্ব দিয়ে জয় করেছো। আমি এখন এক নতুন রূপ পেতে চাই— ছায়া নয়, ছায়াসঙ্গী হয়ে।”

রাজু হাসে, বলে—

“ছায়া থাকুক, যদি সে রোদের পাশে দাঁড়ায়।”

রাজুরা একটি গম্বুজের মতো তৈরি করে বনের মাঝে— নাম দেয় “স্মৃতি ও স্বপ্নকুঞ্জ”।

সেখানে কেউ চাইলে এসে গল্প বলতে পারে, নিজের যাত্রা লিখে রাখতে পারে, গান গাইতে পারে।

এক দেয়ালে লেখা হয়:

“এটা শেষ নয়। এটা শুরু।”

“বন্ধুত্ব মানে ভয়কে আলিঙ্গন করে এগিয়ে যাওয়া।”

রাজু, কাঠু, সোনা সবাই মিলে তাকায় আকাশের দিকে। তারপর রাজু নিচু হয়ে বলে—

“আমরা জানি, এই গল্প কেউ পড়ছে। হয়তো সে এখনো ভয় পায়, হয়তো একা লাগে…”

কাঠু (হাত নেড়ে):

“শোনো বন্ধু, তুমি একা নও। আমরাও একদিন ভয় পেয়েছিলাম। কিন্তু বন্ধুরা পাশে ছিল, তাই আজ দাঁড়িয়ে আছি।”

সোনা (চোখ টিপে):

“তোমার গল্পও একদিন লেখা হবে। শুধু বলো— ‘শুরু করি?’ ”

স্মৃতিফুল গাছের নিচে রাজু একটা ছোট্ট বোতলে ভরে রাখে—

সময়ঘড়ির কাঁটা

মরিচীকার চোখের জল

ছায়ামায়ার ছায়াপাতা

শব্দচোরের কণ্ঠের ছায়া

এবং বন্ধুদের লেখা চিঠির কাগজ

তার ওপর লেখা:

“এই বোতল খুলবে শুধুই এক নতুন গল্পের শুরুতে।”

 

সমাপ্ত

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2023 Daily Sotter Darpan
Theme Customized BY WooHostBD