
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা নায়ক আজও দর্শকের কাছে কেবল একজন নায়ক নন, বরং এক সময়ের সামাজিক বাস্তবতা, গ্রামীণ আবেগ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতীক। ১৫ মে তাঁর মৃত্যুদিনে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রাঙ্গন আবারও স্মরণ করছে সেই মানুষটিকে, যিনি পর্দায় যেমন ছিলেন প্রাণবন্ত, বাস্তব জীবনেও ছিলেন সংগ্রামী ও স্পষ্টভাষী এক ব্যক্তিত্ব।
১৯৪৮ সালের ১৮ আগস্ট ঢাকায় জন্ম নেওয়া ফারুকের প্রকৃত নাম ছিল আকবর হোসেন পাঠান। পুরান ঢাকার আবহে বেড়ে ওঠা এই মানুষটি ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছিল। পরে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধেও সক্রিয়ভাবে অংশ নেন তিনি। বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের শুরুর প্রতিরোধযুদ্ধেও তিনি অংশ নিয়েছিলেন।
চলচ্চিত্রে তাঁর যাত্রা শুরু হয় পরিচালক এইচ আকবর পরিচালিত জলছবি সিনেমার মাধ্যমে। তবে দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে দেন ১৯৭৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সুজন সখী ও লাঠিয়াল চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। গ্রামীণ পটভূমি, সহজ-সরল সংলাপ আর স্বাভাবিক অভিনয়ের কারণে খুব দ্রুতই তিনি সাধারণ মানুষের নায়ক হয়ে ওঠেন। সারেং বৌ, নয়নমণি, গোলাপী এখন ট্রেনে, সাহেব, দিন যায় কথা থাকে—এমন বহু চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় এখনও বাংলা সিনেমার ইতিহাসে আলোচিত।
বাংলা চলচ্চিত্রে ফারুকের জনপ্রিয়তার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল তাঁর অভিনয়ের স্বতঃস্ফূর্ততা। তিনি শহুরে চাকচিক্যের চেয়ে গ্রামের মানুষের ভাষা, জীবনসংগ্রাম ও আবেগকে বেশি বিশ্বাস করতেন। ফলে তাঁর চরিত্রগুলো দর্শকের কাছে কৃত্রিম মনে হয়নি কখনও। “মিয়া ভাই” নামে পরিচিত এই অভিনেতা ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন মধ্যবিত্ত ও গ্রামীণ জীবনের প্রতিনিধিত্বকারী এক সাংস্কৃতিক মুখ।
অভিনয়ের স্বীকৃতিও পেয়েছেন জীবদ্দশায়। ১৯৭৫ সালে লাঠিয়াল চলচ্চিত্রের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। পরবর্তীতে ২০১৬ সালে তাঁকে আজীবন সম্মাননা প্রদান করা হয়। চলচ্চিত্রে তাঁর দীর্ঘ অবদানকে বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
চলচ্চিত্রের পাশাপাশি রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন ফারুক। তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মনোনয়নে ঢাকা-১৭ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল তাঁর শিল্পীসত্তা। সহকর্মীরা প্রায়ই বলতেন, চলচ্চিত্র ও দেশ—এই দুই বিষয় নিয়েই তিনি সবচেয়ে বেশি কথা বলতেন।
দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ২০২৩ সালের ১৫ মে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তাঁর মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অসংখ্য মানুষ শোক প্রকাশ করেন। পরে গাজীপুরের কালীগঞ্জে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

ফারুকের মৃত্যু কেবল একজন অভিনেতার বিদায় ছিল না; এটি ছিল বাংলা চলচ্চিত্রের এক আবেগঘন অধ্যায়ের সমাপ্তি। আজকের দিনে যখন বাংলা সিনেমা নতুন ভাষা ও নতুন দর্শকের সন্ধান করছে, তখন ফারুকের অভিনীত চলচ্চিত্রগুলো এখনও মনে করিয়ে দেয়—সত্যিকারের জনপ্রিয়তা আসে মানুষের জীবনকে স্পর্শ করতে পারলে। তাঁর সিনেমার সংলাপ, হাসি, গ্রামীণ চরিত্রের সরলতা আর পর্দাজুড়ে মানবিক উপস্থিতি এখনও দর্শকের স্মৃতিতে অমলিন।