
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: আজ কিংবদন্তি অভিনেত্রী ও নৃত্যশিল্পী জোহরা সেহগল-এর জন্মবার্ষিকী। ১৯১২ সালের ২৭ এপ্রিল ব্রিটিশ ভারতের সাহারানপুরে জন্ম নেওয়া এই অসামান্য শিল্পী এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ভারতীয় মঞ্চ, চলচ্চিত্র ও আন্তর্জাতিক বিনোদন জগতে নিজের উজ্জ্বল উপস্থিতি রেখে গেছেন।
শৈশব ও গঠনকাল:
জোহরা সেহগলের জন্ম হয়েছিল এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন প্রাণবন্ত ও সাহসী—গাছে চড়া, খেলাধুলা—এসব ছিল তার নিত্যসঙ্গী। পরবর্তীতে ইউরোপে গিয়ে তিনি আধুনিক নৃত্যশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং জার্মানির বিখ্যাত নৃত্যশিক্ষা প্রতিষ্ঠান মেরি উইগম্যান স্কুল-এ পড়াশোনা করেন, যেখানে তিনি প্রথম ভারতীয় শিক্ষার্থী হিসেবে ভর্তি হন।
নৃত্য থেকে অভিনয়ে উত্থান:
১৯৩০-এর দশকে তিনি কিংবদন্তি নৃত্যশিল্পী উদয় শঙ্কর-এর নৃত্যদলে যোগ দেন এবং বিশ্বব্যাপী সফর করেন। এই অভিজ্ঞতা তার শিল্পীজীবনের ভিত্তি গড়ে দেয়।
পরবর্তীতে তিনি ভারতীয় গণনাট্য সংঘ (IPTA) ও পৃথ্বী থিয়েটার-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে মঞ্চনাটকে অভিনয় করেন। প্রায় ১৪ বছর ধরে তিনি থিয়েটারের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন, যা তাকে ভারতীয় নাট্যজগতের এক অনন্য ব্যক্তিত্বে পরিণত করে।
চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনে সাফল্য:
১৯৪০-এর দশকে চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু করেন জোহরা সেহগল। তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে—Neecha Nagar (কান চলচ্চিত্র উৎসবে স্বীকৃত), Bhaji on the Beach (১৯৯২), Dil Se.. (১৯৯৮), Bend It Like Beckham (২০০২)
Veer-Zaara (২০০৪), Cheeni Kum (২০০৭)। এছাড়া তিনি জনপ্রিয় টিভি সিরিজ The Jewel in the Crown, Tandoori Nights ও Amma and Family-এ অভিনয় করেন। আশ্চর্যজনকভাবে, ৯০ বছর বয়সেও তিনি চলচ্চিত্রে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন—যা তার অদম্য কর্মশক্তির প্রমাণ।
সম্মাননা ও স্বীকৃতি:
দীর্ঘ কর্মজীবনে জোহরা সেহগল অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—পদ্মশ্রী (১৯৯৮), কালিদাস সম্মান (২০০১), সংগীত নাটক আকাদেমি, ফেলোশিপ (২০০৪), পদ্ম বিভূষণ (২০১০)।
এই সম্মাননাগুলো তাকে ভারতীয় সংস্কৃতি ও শিল্পকলার এক অমর ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
জীবনের শেষ অধ্যায়:
জোহরা সেহগল ২০১৪ সালের ১০ জুলাই, ১০২ বছর বয়সে নয়াদিল্লিতে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন কর্মচঞ্চল ও প্রাণবন্ত—যা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছে।
মূল্যায়ন:
জোহরা সেহগল শুধু একজন অভিনেত্রী নন—তিনি এক চলমান ইতিহাস। নৃত্য, নাটক ও চলচ্চিত্র—তিনটি মাধ্যমেই তিনি সমান দক্ষতায় কাজ করেছেন। তার জীবন প্রমাণ করে, শিল্পের প্রতি ভালোবাসা ও অধ্যবসায় থাকলে বয়স কখনো বাধা হতে পারে না।
তার জন্মদিন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শিল্প শুধু পেশা নয়, এটি জীবনযাপনের এক অনন্য ভাষা।