
আতাউর রহমান জসি ঝিকরগাছা (যশোর) থেকে: ঝিকরগাছা যশোর প্রতিনিধি : দেশের বস্ত্রশিল্পের অন্যতম কাঁচামাল তুলা। প্রতিবছর তুলা আমদানিতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা গুনতে হয়। তুলার আমদানি নির্ভরতা কমাতে সরকার কৃষকদের প্রণোদনার মাধ্যমে তুলা চাষের সম্প্রসারণ,উৎপাদন বৃদ্ধি ও কৃষকদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে চাই। জাতীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে চাই। অথচ একটি অশুভচক্র বিদেশ থেকে মানহীন তুলাবীজ আমদানি,বাজারজাতকরণ ও কৃষককে তা নিতে বাধ্য করছে বলে গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই দুষ্ট চক্রের সাথে জড়িত রয়েছে তুলা সেক্টরের কতিপয় কর্তা ব্যক্তি। জানাগেছে,গোটা যশোর জোনের ১৬টি তুলা উৎপাদন ইউনিটের আওতায় প্রণোদনার তালিকাভুক্ত ৩হাজার তুলাচাষি রয়েছেন।মানসম্মত ভালো বীজ না পাওয়ায় তারা ঝুঁকির মধ্যে পড়তে যাচ্ছেন বলে আশংকা প্রকাশ করেছেন।এসব তুলাচাষীদের অনেকে দীর্ঘদিন ধরে তুলাচাষের সাথে জড়িত ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন। লাভজনক তুলাচাষের মাধ্যমে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন অনেকে। কিন্তু, তুলাবীজ কারসাজিতে পড়ে তুলাচাষীরা মারাত্মক ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন। উৎপাদন ঝুঁকিতে পড়লেও প্রণোদনার তালিকা থেকে বাদ পড়ার ভয়ে কৃষকেরা নাম প্রকাশে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছেন। সরেজমিন তথ্যানুসন্ধানে তুলা চাষীদের কাছ থেকে তুলা চাষ ঘিরে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে। কৃষকেরা তুলার আবাদ ও তুলা সেক্টর নিয়ে তাদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কথা জানিয়েছেন । তুলে ধরেছেন সম্ভাবনার কথাও।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে,বাংলাদেশ তুলাউন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন বৃহত্তর যশোর রিজিয়নের মনিরামপুর,ঝাপা,যশোর সদর,খাজুরা, ঝিকরগাছা-১ ও ২,কেশবপুর,শার্শা, উলাসী,চৌগাছা, হাকিমপুর,পুড়োপাড়া, চুকনগর,বারোবাজার,কালিগঞ্জ সহ ১৬টি কটন ইউনিটের অন্তর্ভুক্ত তুলা চাষীদের মাঝে তুলা বীজ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান সুপ্রিম শীড কোম্পানির ‘হোয়াইট গোল্ড-১ ও হোয়াইট গোল্ড-২ এর তুলাবীজের চাহিদা থাকা সত্বেও অপর বীজ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ইস্পাহানি কোম্পানির ‘লাল তীর’ ও বিএম-৪ ব্র্যান্ডের তুলা বীজ নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। ভুক্তভোগী তুলা চাষীদের অভিযোগ, গেল ৪/৫বছর আগে একবার লাল তীর তুলাবীজ ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু ফলন ভালো হয়নি। পক্ষান্তরে কৃষকদের দাবি এবছর হোয়াইট গোল্ড ব্রান্ডের বীজ ব্যবহার করে প্রতি বিঘা জমিতে ১০/১২মন বীজ তুলা উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, কৃষকদের চাহিদাকে পাশকাটিয়ে কয়েক বছরের পুরাতন তুলাবীজ নিতে তুলা চাষীদের বাধ্য করা হচ্ছে। ভুক্তভোগী কৃষকেরা গুরুতর এই অভিযোগের আঙ্গুল তুলেছেন যশোর জোনের প্রধান তুলা উন্নয়ন কর্মকর্তা মিজানুর রহমানের দিকে। যদিও অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি তার ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন। মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের অভিযোগে জানা গেছে, প্রধান তুলা উন্নয়ন কর্মকর্তা মিজানুর রহমান ১৬টি কটন ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ইস্পাহানি কোম্পানির আমদানিকৃত তুলাবীজ নিতে নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করছেন। গোটা যশোর অঞ্চলের তুলা চাষিরা তুলা বীজ বপনের জন্য বীজতলা তৈরির জোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এরই মধ্যে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের ৫০জন ও বারোবাজার ইউনিটের আওতাধীন ৩৫০জন প্রণোদনার তালিকাভুক্ত কৃষকের মাঝে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে মানহীন তুলা বীজ চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। সরবরাহকৃত এই বীজের অঙ্কুরোদ্গম ক্ষমতা অত্যন্ত কম বলে দাবি করেছেন কৃষকেরা। ফলে,তুলাচাষ লাভজনক হওয়া সত্ত্বেও কাঙ্খিত উৎপাদনের মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়তে যাচ্ছেন ভুক্তভোগী কৃষকেরা। অভিযোগ উঠেছে, মাঠ পর্যায়ের প্রতিটি ইউনিট প্রধানদের মাধ্যমে কৃষকদের মাঝে মানহীন পুরাতন তুলাবীজ চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। এ ব্যাপারে ঝিকরগাছা ইউনিট-০১এর দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউনিট কর্মকর্তা আসাদ হোসেন দাবি করেন, কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী লাল তীর ব্যান্ডের তুলা বীজ সরবরাহ করা হয়েছে। তিনি বলেন, গেল বছর তার ইউনিটে তুলা চাষীর সংখ্যা ছিল সাড়ে চার’শ জন। এবছর ৬০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে। ২৫০কেজি মোট তুলা বীজের চাহিদার বিপরীতে অর্ধেক ইতোমধ্যে সরবরাহ পেয়েছেন। লাল তীর ব্র্যান্ডের বীজ সরবরাহ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। চৌগাছা ও হাকিমপুর ইউনিটের অফিসার আবু সাঈদ জানান, তার ইউনিটের ৫৩০ জন প্রণোদনার তালিকাভুক্ত তুলাচাষীর চাহিদা ৩৫০কেজির বিপরীতে ১৪৩কেজি চায়না হাইব্রিড জাতের লাল তীর ব্রান্ডের তুলা বীজের সরবরাহ পেয়েছেন। অবশিষ্ট তুলা বীজ শীঘ্র পাবেন বলে জানান তিনি। অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা ও উৎপাদন কম হওয়ায় লাল তীর ব্র্যান্ডের বীজ নিতে কৃষকেরা অনিচ্ছা প্রকাশ করা সত্ত্বেও জোর করে কৃষকদের মাঝে সরবরাহ করা হচ্ছে কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সেটি আমার পক্ষে বলা সম্ভব না। আমরা যা সরবরাহ পেয়েছি তাই কৃষকের মাঝে বিতরণ করছি। এ প্রতিবেদকের সাথে কথা হয়,চৌগাছা উপজেলার জগদীশপুর গ্রামের তুলাচাষী মাসুদ হোসেন ও বেড়গোবিন্দপুর গ্রামের হারুন,বাবলুর রহমান ও কোমরপুর গ্রামের আব্দুর রহিমের সাথে। তারা লাল তীর ব্র্যান্ডের তুলার বীজের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে কাঙ্খিত উৎপাদনে সংশয় প্রকাশ করেন। একই রকম অনিচ্ছা প্রকাশ করেছেন ঝিকরগাছা উপজেলার পানিসারা ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামের তুলাচাষী শফিকুল ইসলাম, নির্বাসখোলা ইউনিয়নের শিওরদাহ গ্রামের শিমুল হোসেন ও আব্দুর রাজ্জাক,ঝিকরগাছা সদর ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর গ্রামের আসাদুজ্জামান ও জাহাঙ্গীর হোসেন।
জানাগেছে, এবছর ১৬টি তুলা উৎপাদন ইউনিটের আওতাধীন ৩ হাজার তুলাচাষী (প্রণোদনার তালিকাভুক্ত) ৩হাজার বিঘা জমিতে বীজতুলার আবাদ করবেন। যার গড় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫/৪০হাজার মণ বীজতুলা।জনপ্রতি কৃষকের ১বিঘা জমিতে গড় উৎপাদন হার ১২/১৫মন। প্রতিমণ বীজ তুলার বাজারমূল্য ৪হাজার টাকা। সেই হিসাবে কৃষক পায় ৫৫/৬০হাজার টাকা। এরমধ্যে জনপ্রতি কৃষক প্রণোদনা পান ৮হাজার টাকা। প্রণোদনার জনপ্রতি কৃষক পান ৬’শ গ্রাম তুলাবীজ,সার ও কীটনাশক। ১৬টি ইউনিটের ৩হাজার তুলাচাষীর সর্বমোট তুলা বীজের চাহিদা রয়েছে ১হাজার ৮শ কেজি তুলা বীজ। এরমধ্যে কালীগঞ্জ ও বারবাজার ইউনিটের তুলা চাষীদের মাঝে ৬০কেজি অনুন্নত এই বিতর্কিত তুলা বীজ সরবরাহ করা হয়েছে বলে জানাগেছে। অভিযোগ উঠেছে,বৃহত্তর যশোর জোনের অন্যান্য কটন ইউনিটের আওতাধীন তুলা চাষীদের মাঝে স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে বিতর্কিত এই বীজ চাপিয়ে দেয়ার অশুভ পায়তারা চলছে। চলতি মৌসুমে যা তুলা চাষের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা। কর্মকর্তার স্বেচ্ছাচারিতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তুলা চাষিরা। অথচ গুণগত মানসম্পন্ন তুলাবীজ বপণে দ্বিগুণ উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি মানসম্মত তুলা উৎপাদনে তুলা চাষীদের আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার বিরাট সম্ভাবনাও রয়েছে। প্রসঙ্গত ৭৬-৭৭সালের দিকে গোটা যশোর অঞ্চল জুড়ে তুলা চাষের অমিত সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। বলা যায়, তুলা চাষের বিপ্লব ঘটেছিল। অথচ অপার সম্ভাবনাময় তুলা চাষ ধ্বংস করতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল একশ্রেণির দেশি-বিদেশি বেনিয়াচক্র। আর এই অপকর্মের সাথে জড়িয়ে পড়েছিল তুলা উন্নয়ন বোর্ডের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা। নানা অনিয়ম অব্যবস্থাপনা ও লাগামছাড়া দুর্নীতির কারণে তুলা সেক্টরে নেমে এসেছিল চরম বিপর্যয়। তুলা চাষ এক প্রকার হারিয়ে গিয়েছিল। গেল কয়েক বছর এতদাঞ্চল জুড়ে ফের যখন তুলা চাষিরা ঘুরে দাঁড়িয়েছে ঠিক তখনই যেন তুলা চাষের সম্ভাবনার আকাশে দুর্যোগের কালো মেঘের ঘনঘটা দেখা দিচ্ছে!
বলা বাহুল্য, দেশের বস্ত্র শিল্পের অন্যতম কাঁচামাল তুলা। যা প্রায় সম্পূর্ণ আমদানির্ভর। প্রতিবছর লাখ লাখ বেল তুলা দেশের কটন মিলের উৎপাদনের চাকা সচল রাখতে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়ে আমদানি করতে হয়।বস্ত্রশিল্পের চাহিদা মেটাতে আমদানি নির্ভরতা কমাতে ও তুলা চাষের সম্প্রসারণ ঘটাতে সরকার কৃষকদের প্রণোদনা দিচ্ছে। কাঙ্খিত উৎপাদনের সম্ভাবনাও দেখা দিচ্ছে। আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে কৃষক। দেশে ক্রমবর্ধমান তুলাচাষ বৃদ্ধি ও উৎপাদন ঘিরে বেশকিছু জিনিং ফ্যাক্টরি গড়ে উঠেছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে।বেকারত্ব দূর হচ্ছে।
বাংলাদেশ তুলা উন্নয়ন বোর্ড যশোর জোনের উপ-পরিচালক (ডিডি)মোজাদ্দেল আল শামীম এঁর সাথে একাধিকবার তার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সংযোগ না পাওয়ায় তাঁর বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ তুলা উন্নয়ন বোর্ড যশোর জোনের প্রধান তুলা উন্নয়ন কর্মকর্তা মিজানুর রহমানের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি কৃষকের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “প্রণোদনার বীজ সরকার কৃষককে ফ্রি দেয়। লাল তীর কিংবা সুপ্রিম কোন কোম্পানির বীজ খারাপ না। সব বীজের গুণগতমান ও উৎপাদন ভালো। তাছাড়া বীজ আমদানির ক্ষেত্রে চাহিদা পত্র,গেজেট ও রেজুলেশন এর মাধ্যমে বীজ সরবরাহের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। কিন্তু, কোন কোম্পানি যদি বীজ সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয় বা অপারগতা প্রকাশ করে সেক্ষেত্রে আমাদের কিছু করার থাকে না। আমরা সব সময় কৃষকের স্বার্থের কথা বিবেচনা করি”।
উল্লেখ্য তুলা বীজের তেল কোলেস্টেরল মুক্ত,ভোজ্যতেল হিসেবে এর চাহিদা ব্যাপক। তুলা বীজ থেকে তৈরি হয় জৈব সার,গবাদি পশু ও মাছের খাদ্য। অথচ বহুমাত্রিক ব্যবহার্য অমিত সম্ভাবনার তুলা সেক্টরকে একটি অশুভচক্র পরিকল্পিতভাবে নস্যাৎ করতে চাইছে। কৃষকদের দাবি সরকারের উচ্চপর্যায়ে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে তুলা চাষীরা হতাশাগ্রস্থ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।