
শিশুতোষ গল্প লাঠিম (১ম খণ্ড)
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি
পাশের গ্রামটার নাম ধলেশ্বরীপুর। ছোট্ট, শান্ত, নদীর পাড়ঘেঁষা একটা গ্রাম। গ্রামের ভেতর দিয়ে কাঁচা রাস্তা চলে গেছে বাঁক নিয়ে, বাঁশঝাড়, আমগাছ আর তালগাছের আড়ালে লুকোচুরি খেলে। সেই গ্রামেই থাকে দশ বছরের এক ছেলে—রাফি। ওর বাবা মুসা মিয়া একজন ছোটখাটো কুলি; নদীর ভাঁটে বালুবোঝাই নৌকা থেকে বস্তা নামানো-তোলার কাজ করেন। মা রহিমা বেগম গৃহিণী। খুব সাদাসিধে, শান্ত পরিবার।
রাফির একটা দোষ আছে—ও খুবই জেদি, আবার খুবই সংবেদনশীল। নিজের জিনিস হারালে বা ভেঙে গেলে এক সপ্তাহ মন খারাপ করে বসে থাকে। খেলাধুলা খুব পছন্দ, বিশেষ করে লাঠিম। পুরো গ্রামে লাঠিম ঘোরানোর সবচেয়ে বড় ভক্ত যদি কেউ থাকে, সে হলো রাফি। স্কুল থেকে ফিরেই ব্যাগ ছুড়ে রেখে দৌড় দিত বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে।
কিন্তু সমস্যা হলো—রাফির নিজের একটা ভালো লাঠিম নেই।
তার কাছে আছে একটা পুরোনো, সস্তা লাঠিম, বারবার লাগিয়ে দিলেও বেশিক্ষণ ঘোরে না। চারদিকে যখন তার বন্ধুরা নতুন চকচকে লাঠিম বের করে খেলে, তখন রাফির বুকের ভেতরটা হুহু করে ওঠে।
একদিন স্কুল ছুটির পর মাঠে লাঠিম প্রতিযোগিতা হলো। মাসুদ, ইমন, জিকো—সবাই নতুন লাঠিম নিয়ে এল। লাল-নীল-বেগুনি রঙের লাঠিমগুলো রোদে চকচক করছিল। রাফি তার পুরোনো কাঠের লাঠিমটা হাতের মুঠোয় চেপে ধরে দাঁড়িয়েছিল।
রাফি চেষ্টা করল, মন দিয়ে চেষ্টা করল, কিন্তু তার লাঠিম দশ সেকেন্ডও ঘোরে না। ইমনেরটা প্রায় দুই মিনিট ঘুরে ঘুরে যেন উড়তে চাইছিল। প্রতিযোগিতা শেষে ইমন প্রথম হলো। আর রাফি দাঁড়িয়ে রইল চুপচাপ, মাথা নিচু করে।
বাড়ি ফিরে এসে রাফি খাওয়া-দাওয়া করল না। খাটে মুখ গুঁজে শুয়ে রইল। মা অনেক ডাকলেন, কিন্তু রাফি সাড়া দিল না।
— কি হইছে, বাবা? — মা জিজ্ঞেস করলেন।
— আমার লাঠিমটা ভালো না… — রাফির চোখে পানি।
— ওরে রাফি, লাঠিম না থাকলে কী হইছে? মানুষ হতে হবে বড়, হয় না?
— কিন্তু আমি খেলতে পারি না মা। সবাই হাসে।
মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাদের সংসারে নতুন লাঠিম কেনার টাকা নেই। বাবার কষ্টের টাকা দিয়ে প্রথমে সংসার চলে, তারপর পড়াশোনা; খেলাধুলার জন্য কিছুই থাকে না। কিন্তু মা রাফির মনভাঙা মুখ দেখে আর সহ্য করতে পারলেন না।
সেই রাতে বাবা বাড়ি ফিরতেই মা তাঁকে আলাদা করে ডাকলেন।
— শোনেন, রাফির মন খারাপ অনেক। একটা লাঠিম কিনে দেন না?
— টাকা কোথায় রহিমা? কালও বস্তা নামাইতে গিয়া হাত কেটে গেল। দুইশ টাকার বেতন পাইছি। চাল-ডাল কিনতে হবে, ঔষধও লাগবে।
— কিন্তু ছেলের মনটা?
— আমিও তো ওরে ভালোবাসি, কিন্তু সংসার আগে… — মুসা মিয়া কণ্ঠটা ভারী করে বললেন।
রাফি এসব শুনতে পেল। তার মন আরও ভেঙে গেল। ও জানে, বাবা-মা কত কষ্ট করে সংসার চালায়। ওর জন্য আলাদা করে কিছু করতে গেলে তাদের কষ্ট বাড়বে। তাই পরদিন সকালেই রাফি ঠিক করল—সে খারাপ লাঠিম নিয়েই খেলবে। নিজের মতো করে ঘোরাবে। নিজের মতো করে জিতবে।
কিন্তু মানুষের মন তো যন্ত্র নয়—ইচ্ছে করলেই সব বদলে ফেলা যায় না।
একদিন দুপুরে স্কুল বন্ধ হলো বৃষ্টির কারণে। রাফি একা হাঁটছিল ঘাটের দিকে। নদীর পানি ফুলে উঠেছে, বাতাসে কচুরিপানাগুলো দুলছে। দূরে একজন কাচা বাঁশ দিয়ে কিছু বানাচ্ছিলেন। রাফি কাছে গিয়ে দেখল—লোকটা লাঠিম বানাচ্ছেন!
মাটির উপর ছড়ানো রঙের ডিব্বা, পাতলা কাঠ, ছোট ছুরি—সব মিলে যেন শিল্পীর মঞ্চ। লোকটির দাড়ি সাদা, চোখে শান্ত তাকানো।
লোকটা রাফিকে দেখে হাসল।
— কি রে বাছা, দাঁড়িয়ে আছিস কেন?
— আপনি কি লাঠিম বানান চাচা?
— হ্যাঁ রে, ছোটবেলা থেকে বানাই। এখন বয়স হইছে, কাজ কমাইছি।
— একটা লাঠিম… বানিয়ে দিতে পারবেন?
— কেন নয়? কিন্তু টাকাটা দিতে পারবি তো?
রাফির মুখ নিস্তেজ হয়ে গেল। মাথা নিচু করে বলল,
— আমার কাছে টাকা নাই।
বৃদ্ধ লোকটা চুপচাপ রাফির দিকে তাকাল। তারপর মৃদু হাসল।
— টাকা নাই মানে? লাঠিম কি শুধু টাকার জন্য হয়? তোর চোখে যে আগ্রহ দেখি, অনেকদিন দেখি নাই। চল, তোর জন্য একটা লাঠিম বানাই।
রাফি অবাক!
— সত্যি চাচা?
— সত্যিই। তুই একটু বস, দেখি কোন কাঠটা ভালো হয়।
বৃদ্ধ লোকটা কাঠ বেছে নিলেন, তারপর ছুরি দিয়ে কেটে কেটে একটা গোল আকৃতি দিলেন। ধীরে ধীরে কাঠটা লাঠিমের রূপ নেয়। রাফি মুগ্ধ হয়ে দেখছে—ছুরি চলার শব্দ, কাঠের শুষ্ক গন্ধ, আর বৃদ্ধ লোকটার মনোযোগ। যেন শিল্প তৈরি হচ্ছে।
লোকটা বললেন,
— লাঠিম বানানো শুধু হাতের কাজ না রে, মনটাও দিতে হয়। মন দিয়ে বানালে লাঠিম ঘোরে, নইলে পড়ে যায়।
রাফি মাথা দোলাল।
কিছুক্ষণ পরে লাঠিমটা পুরো তৈরি হয়ে গেল। রং করা হলো লাল-নীল-হলুদ মিশিয়ে। শেষে নিচের মাথায় ছোট্ট পেরেক টোকা লাগিয়ে দিলেন।
— নিয়ে যা, এটা তোর।
— চাচা… আমি কি কিছু দিতে পারি?
— হুঁ, একটা কথা দিবি—কখনো কাউরে ছোট করে দেখবি না। লাঠিম যেমন ঘুরতে ঘুরতে আবার ওঠে, মানুষও তেমনি পড়ে যাইলে আবার উঠতে পারে। মনে রাখবি।
— রাখব চাচা!
রাফি আনন্দে দৌড়ে বাড়ি ফিরল। কিন্তু সে কাউকে কিছু বলল না। ভাবল, কাল মাঠে সবাইকে চমকে দেবে।
পরদিন বিকেলে মাঠে প্রতিযোগিতা হলো। গ্রামে “বড় লাঠিম খেলা” নামে একটা ছোট উৎসব হয়। সবাই ভিড় জমাল। মেম্বার সাহেবও এলেন।
রাফি তার নতুন লাঠিমটা কাপড়ে মোড়ানো অবস্থায় ব্যাগে রেখেছিল। বন্ধুরা ভাবল, তার পুরোনো লাঠিমটাই আছে।
প্রথম রাউন্ড শুরু হলো। মাসুদ, ইমন, জিকো—সবাই ঘোরালো তাদের লাঠিম। রঙিন লাঠিমগুলো ঘুরতে লাগল মাটিতে টুং-টুং শব্দ করে।
রাফি ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো।
— এবার তুই, রাফি! — সবাই বলল।
রাফি ব্যাগ খুলে নতুন লাঠিমটা বের করল। সবাই “ওহ্!” বলে উঠল।
ইমন বলল,
— এটা কোথায় পাইলি?
— বানিয়ে দিয়েছে এক চাচা।
— দেখি, কতক্ষণ ঘোরে!
রাফি লাঠিমটা শক্ত করে ধরল, তারপর দড়িটা পাকিয়ে একবার নিশ্বাস নিল। বৃদ্ধ লোকটার কথা মনে পড়ল—“মনে দিয়া বানানো জিনিস মন দিয়া চালাতে হয়।”
সে শক্ত করে দড়ি টান দিল—
ঝুঁশশশশশ!
লাঠিমটা মাটিতে ছুটে গিয়ে ঘুরতে লাগল। এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড, দশ সেকেন্ড, বিশ সেকেন্ড… ঘুরছে, ঘুরছেই। সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল।
ইমনের লাঠিম থেমে গেল। মাসুদেরটাও থেমে গেল। কিন্তু রাফির লাঠিম এখনও নাচছে, ঘুরছে, উড়ছে যেন!
এক মিনিট… দুই মিনিট… তারপর ধীরে ধীরে লাঠিম