
চলচ্চিত্র সাংবাদিকঃ ফাহিম শাহরিয়ার রুমি – বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও নাট্যজগতে যেসব শিল্পী দীর্ঘ সময় ধরে অভিনয় ও সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে গভীর প্রভাব রেখে গেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন A. T. M. Shamsuzzaman। তিনি শুধু একজন শক্তিশালী অভিনেতাই নন, বরং গল্পকার, চিত্রনাট্যকার ও চলচ্চিত্রকার হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। প্রায় পাঁচ দশকের দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি ৪০০-এর বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন এবং বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে চরিত্রাভিনয়ের একটি শক্তিশালী ধারা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর অভিনয়শৈলী, কৌতুকবোধ এবং চরিত্রের গভীরতা তাঁকে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি অনন্য স্থান দিয়েছে। জন্ম ও পারিবারিক পটভূমিঃ এটিএম শামসুজ্জামান জন্মগ্রহণ করেন ১০ সেপ্টেম্বর ১৯৪১ সালে নোয়াখালীর দৌলতপুরে। তাঁর পূর্ণ নাম আবু তাহের মোহাম্মদ শামসুজ্জামান। তাঁর পিতা নুরুজ্জামান ছিলেন একজন আইনজীবী এবং তিনি রাজনীতিবিদ শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের সঙ্গে কাজ করতেন। তাঁর মাতা নুরুন্নেছা বেগম।
তিনি পরিবারে জ্যেষ্ঠ সন্তান ছিলেন। শৈশবের একটি অংশ ঢাকায় কাটে। তিনি ঢাকার ঐতিহ্যবাহী পোগোজ স্কুলে পড়াশোনা করেন এবং পরবর্তীতে অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও অধ্যয়ন করেন। কৈশোরে তাঁর স্বপ্ন ছিল চিকিৎসক হওয়া; কিন্তু পরে চলচ্চিত্র ও নাট্যজগতের প্রতি আগ্রহ তাঁকে অভিনয় ও সৃজনশীলতার পথে নিয়ে আসে। চলচ্চিত্রে প্রবেশ ও প্রারম্ভিক কর্মজীবনঃ শামসুজ্জামানের চলচ্চিত্রজীবন শুরু হয় অভিনয় দিয়ে নয়, বরং সহকারী পরিচালক হিসেবে। ১৯৬১ সালে তিনি পরিচালক উদয়ন চৌধুরীর চলচ্চিত্র বিষকন্যা-তে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন। একই সময়ে তিনি গল্প ও চিত্রনাট্য রচনা করতেও শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান এবং ধীরে ধীরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর নির্মিত অন্যতম চলচ্চিত্র ওরা ১১ জন-এ তিনি একটি চরিত্রে অভিনয় করেন। এই চলচ্চিত্রটি তাঁর অভিনয়জীবনের প্রাথমিক ধাপকে দৃঢ় করে। টেলিভিশনে জনপ্রিয়তাঃ বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক সংসপ্তক-এ “রমজান” নামের নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। এই নাটকের মাধ্যমে তাঁর অভিনয়ক্ষমতা প্রথমবারের মতো ব্যাপকভাবে আলোচিত হয় এবং তিনি দর্শকের নজরে আসেন।

তিনি অসংখ্য টেলিভিশন নাটকে কাজ করেন। নাট্য নির্মাতা সালাউদ্দিন লাভলুর নাটকে তিনি বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেন। চলচ্চিত্রে সাফল্য ও অভিনয় বৈশিষ্ট্যঃ ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে শক্তিশালী ভিলেন চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। পরিচালক Amjad Hossain-এর চলচ্চিত্র নয়নমণি তাঁর অভিনয়জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় সৃষ্টি করে। এই ছবিতে তাঁর অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের কাছে প্রশংসিত হয়। পরবর্তীতে তিনি বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে বহুমাত্রিক অভিনেতা হিসেবে পরিচিতি পান। কখনও তিনি ভয়ংকর ভিলেন, কখনও হাস্যরসাত্মক চরিত্র, আবার কখনও গভীর মানবিক চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তিনি যে সব উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তার মধ্যে রয়েছে—নয়নমনি, গোলাপী এখন ট্রেনে, সূর্য দীঘল বাড়ি, দায়ী কে, শাস্তি, হাজার বছর ধরে, মোল্লা বাড়ির বউ, চাঁদের মতো বউ, মন বসেনা পড়ার টেবিলে প্রভৃতি। এই সব চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় বাংলাদেশের জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে। চিত্রনাট্য ও সাহিত্যকর্মঃ শুধু অভিনেতা হিসেবে নয়, শামসুজ্জামান একজন দক্ষ গল্পকার ও চিত্রনাট্যকারও ছিলেন। তিনি শতাধিক গল্প ও চলচ্চিত্রের স্ক্রিপ্ট রচনা করেছেন। তাঁর লেখা গল্প ও চিত্রনাট্যের মধ্যে গ্রামীণ জীবন, সামাজিক বাস্তবতা এবং মানুষের অন্তর্গত দ্বন্দ্বের বিষয়গুলো প্রায়ই উঠে এসেছে।
তিনি জলছবি চলচ্চিত্রের গল্প ও চিত্রনাট্য লেখেন, যা তাঁর সাহিত্যিক ও সৃজনশীল ক্ষমতার পরিচয় বহন করে। তিনি প্রায় ৫৩টির মত চলচ্চিত্রের কাহিনী, সংলাপ ও চিত্রনাট্য লেখেন। পুরস্কার ও স্বীকৃতিঃ এটিএম শামসুজ্জামান তাঁর দীর্ঘ অভিনয়জীবনে বহু পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন। তিনি মোট ছয়বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য— শ্রেষ্ঠ অভিনেতা – দায়ী কে? (১৯৮৭) শ্রেষ্ঠ কৌতুক অভিনেতা – ম্যাডাম ফুলি (১৯৯৯) শ্রেষ্ঠ কৌতুক অভিনেতা – চুরিওয়ালা (২০০১) শ্রেষ্ঠ কৌতুক অভিনেতা – মন বসেনা পড়ার টেবিলে (২০০৯) শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা – চোরাবালি (২০১২) আজীবন সম্মাননা – জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (২০১৭) এছাড়া ২০১৫ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদক প্রদান করে। ব্যক্তিজীবন ও মৃত্যুঃ ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন সাদামাটা জীবনযাপনের মানুষ। তাঁর পরিবারে স্ত্রী, তিন কন্যা ও এক পুত্র রয়েছে। দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভোগার পর ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২১ সালে ঢাকার নিজ বাসভবনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ৮০ বছর।
মূল্যায়নঃ এটিএম শামসুজ্জামান বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অনন্য চরিত্রাভিনেতা। তাঁর অভিনয়ের বিশেষত্ব ছিল চরিত্রের গভীর মনস্তত্ত্ব তুলে ধরা এবং সংলাপের স্বাভাবিক উপস্থাপন। ভিলেন, কৌতুক অভিনেতা কিংবা চরিত্রাভিনেতা—সব ক্ষেত্রেই তিনি সমান দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও নাট্যজগতের ইতিহাসে তাঁর অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিনয়ের পাশাপাশি গল্প ও চিত্রনাট্য রচনার মাধ্যমে তিনি চলচ্চিত্রের বর্ণনাভঙ্গিকেও সমৃদ্ধ করেছেন। ফলে তিনি শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেতাই নন, বরং বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংস্কৃতির একজন গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা ব্যক্তিত্ব হিসেবেও বিবেচিত।