
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: বাংলাদেশের স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্রে একটি ব্যতিক্রমী ও আলোচিত নাম হলেন আশরাফ শিশির। তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্র আমরা একটি সিনেমা বানাবো (ইংরেজি নাম The Innocence) শুধু বাংলাদেশের চলচ্চিত্রাঙ্গনে নয়, বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসেও এক অনন্য সংযোজন হিসেবে বিবেচিত। এটি এমন একটি চলচ্চিত্র, যা প্রচলিত কাঠামোকে ভেঙে দিয়ে নতুন ধরনের শিল্পভাষা নির্মাণের চেষ্টা করেছে—দৈর্ঘ্য, বয়ান, নির্মাণপ্রক্রিয়া এবং বিষয়বস্তুর গভীরতায় যা একে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে।
চলচ্চিত্রটি ২০১৯ সালে নির্মিত একটি সাদাকালো বাংলা ভাষার পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্র। এটি পরিচালনা ও চিত্রনাট্য করেছেন আশরাফ শিশির এবং প্রযোজনা করেছে Impress Telefilm Limited। নির্মাণের দিক থেকে এটি ছিল দীর্ঘমেয়াদি এক সাধনা—প্রায় নয় বছর ধরে বিভিন্ন সময় ও প্রেক্ষাপটে এই চলচ্চিত্রের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়জুড়ে নির্মাণের ফলে চলচ্চিত্রটি কেবল একটি গল্প নয়, বরং সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত বাস্তবতারও এক দলিল হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে যেখানে দ্রুত নির্মাণ ও বাণিজ্যিক কাঠামো প্রাধান্য পায়, সেখানে এই চলচ্চিত্র একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পথের সন্ধান দেয়।
এই চলচ্চিত্রের সবচেয়ে আলোচিত বৈশিষ্ট্য হলো এর বিস্ময়কর দৈর্ঘ্য—প্রায় ১২৬৫ মিনিট বা প্রায় ২১ ঘণ্টা। বিশ্ব চলচ্চিত্রে এত দীর্ঘ সময়ের অ-প্রায়োগিক (non-experimental) কাহিনিচিত্র অত্যন্ত বিরল। এই দৈর্ঘ্য কেবল সংখ্যার দিক থেকে নয়, এর ভেতরের বয়ান ও অভিজ্ঞতার পরিধিও একইভাবে বিস্তৃত। দর্শক এখানে একটি গল্প দেখেন না, বরং এক ধরনের জীবন-অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেন। চলচ্চিত্রের এই দীর্ঘতা নির্মাতার এক সাহসী শিল্পদৃষ্টির প্রকাশ, যেখানে সময়কে সীমাবদ্ধ না রেখে বরং বিস্তৃত করা হয়েছে।
কাহিনির দিক থেকে চলচ্চিত্রটি প্রেম, স্বপ্ন, রাজনীতি, বিপ্লব এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সমাজ বাস্তবতার নানা স্তরকে ধারণ করে। এটি কোনো একক ন্যারেটিভে আবদ্ধ নয়; বরং বহু চরিত্র, বহু ঘটনা এবং বহু সময়রেখা একসঙ্গে মিলিত হয়ে একটি বিস্তৃত আখ্যান তৈরি করেছে। এখানে গ্রামীণ জীবন, প্রান্তিক মানুষের সংগ্রাম, রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের জটিলতা একসূত্রে গাঁথা হয়েছে। চলচ্চিত্রটি দেখায় কীভাবে ব্যক্তিগত জীবন ও বৃহত্তর ইতিহাস একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত—একটি মানুষের গল্প আসলে একটি সময়ের গল্প হয়ে ওঠে।
চলচ্চিত্রে মানুষের সংগ্রাম ও আকাঙ্ক্ষা অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। চরিত্রগুলো বাস্তব জীবনের মতোই জটিল—তাদের স্বপ্ন আছে, ব্যর্থতা আছে, ভালোবাসা আছে, আবার হতাশাও আছে। সমাজের অন্তর্লীন দ্বন্দ্ব—শ্রেণি বৈষম্য, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন—এসব বিষয় চলচ্চিত্রে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। একই সঙ্গে ভালোবাসা ও মানবিক সম্পর্কের বহুমাত্রিকতা চলচ্চিত্রটিকে আরও মানবিক করে তুলেছে।
অভিনয়ের ক্ষেত্রে চলচ্চিত্রটিতে বাংলাদেশের প্রখ্যাত ও দক্ষ অভিনয়শিল্পীরা অংশগ্রহণ করেছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন রাইসুল ইসলাম আসাদ, মাসুম আজিজ, শাধিন খসরু, সুমনা সোমা, প্রাণ রায় এবং এলিনা শাম্মী। তাঁদের অভিনয় চলচ্চিত্রটির আবেগকে গভীরতা দিয়েছে এবং চরিত্রগুলিকে বাস্তবতার কাছাকাছি নিয়ে গেছে। এত দীর্ঘ চলচ্চিত্রে অভিনয় ধরে রাখা এবং চরিত্রের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা একটি কঠিন কাজ, যা এই শিল্পীরা দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করেছেন।
নির্মাণশৈলীর দিক থেকেও চলচ্চিত্রটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এটি সাদাকালো চিত্রগ্রহণে নির্মিত, যা চলচ্চিত্রটিকে একটি নস্টালজিক এবং একই সঙ্গে বাস্তবধর্মী আবহ প্রদান করেছে। এই সাদাকালো ভিজ্যুয়াল ভাষা চলচ্চিত্রের রাজনৈতিক ও মানবিক বিষয়বস্তুকে আরও তীব্র করে তোলে। চিত্রগ্রহণে একাধিক চিত্রগ্রাহক কাজ করেছেন, এবং দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন লোকেশন ও প্রেক্ষাপটে শুটিং হওয়ায় চলচ্চিত্রটির ভিজ্যুয়াল বৈচিত্র্যও বিস্তৃত হয়েছে।
সংগীত পরিচালনা করেছেন রাফায়েত নেওয়াজ। সংগীত এখানে শুধু বিনোদনের উপাদান নয়, বরং গল্প বলার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। বিভিন্ন দৃশ্যে সংগীতের ব্যবহার আবহ তৈরি করেছে, আবেগকে গভীর করেছে এবং দর্শককে গল্পের ভেতরে টেনে নিয়েছে। একই সঙ্গে শব্দ নকশা ও পরিবেশগত শব্দও চলচ্চিত্রটির বাস্তবতাকে জোরালো করেছে।
চলচ্চিত্রটি ২০১৯ সালের ১৬ মে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডে প্রদর্শিত হয় এবং ১৯ মে আনুষ্ঠানিকভাবে সেন্সর সার্টিফিকেট লাভ করে। এই স্বীকৃতি পাওয়ার মাধ্যমে চলচ্চিত্রটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদর্শনের অনুমতি পায়। তবে এর দৈর্ঘ্যের কারণে প্রচলিত প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে এটি মূলত বিশেষ প্রদর্শনী, চলচ্চিত্র উৎসব বা নির্দিষ্ট আয়োজনের মাধ্যমে দর্শকের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
এই চলচ্চিত্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর নির্মাণে বিপুল সংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণ। প্রায় চার হাজার শিল্পী ও কলাকুশলী এই চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়। এই বিশাল দল নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করা নিজেই একটি বিরল ঘটনা। এটি একটি সমষ্টিগত শিল্পপ্রয়াস, যেখানে বহু মানুষের শ্রম, সময় ও সৃজনশীলতা একত্রিত হয়েছে।
বিশ্ব চলচ্চিত্রের প্রেক্ষাপটে “আমরা একটি সিনেমা বানাবো” একটি বিশেষ অবস্থান তৈরি করেছে। এটি শুধু একটি দেশের চলচ্চিত্র নয়, বরং একটি বৈশ্বিক শিল্পচর্চার অংশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এত দীর্ঘ সময়ের একটি কাহিনিচিত্র নির্মাণের মাধ্যমে পরিচালক প্রচলিত চলচ্চিত্র ভাষাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন এবং নতুন এক দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছেন। এই চলচ্চিত্র দর্শককে ধৈর্য, মনোযোগ এবং গভীরভাবে চিন্তা করার আহ্বান জানায়।
পরিচালক আশরাফ শিশিরের পূর্ববর্তী চলচ্চিত্র গাড়িওয়ালা-তেও আমরা মানবিক গল্প বলার একটি শক্তিশালী ধারা দেখতে পাই। “আমরা একটি সিনেমা বানাবো” সেই ধারারই একটি বিস্তৃত ও পরিণত রূপ, যেখানে তিনি আরও বৃহৎ পরিসরে সমাজ, ইতিহাস ও মানুষের জীবনকে তুলে ধরেছেন। তাঁর