
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে এক অনন্য নাম নায়ক উজ্জ্বল। আজ ২৮ এপ্রিল—এই দিনে ১৯৪৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন এই গুণী অভিনেতা, যার প্রকৃত নাম আশরাফ উদ্দিন আহমেদ উজ্জ্বল। তাঁর জন্মদিনে স্মরণ করা মানে শুধু একজন অভিনেতাকে নয়, বরং বাংলা চলচ্চিত্রের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে ফিরে দেখা।
শৈশব ও শিক্ষাজীবন:
নায়ক উজ্জ্বল জন্মগ্রহণ করেন তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পাবনা জেলার শাহজাদপুরের জান্তিহার গ্রামে। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতকোত্তর (MA) ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবনেই নাটকের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ জন্ম নেয়—বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি ও হলভিত্তিক নাট্যচর্চায় তিনি নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন।
চলচ্চিত্রে অভিষেক ও উত্থান:
উজ্জ্বল প্রথমে ১৯৬৭–৬৯ সময়কালে ঢাকা টেলিভিশনে নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে নিজের শিল্পীজীবন শুরু করেন। এরপর ১৯৭০ সালে কিংবদন্তি নির্মাতা সুভাষ দত্ত পরিচালিত “বিনিময়” চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক ঘটে তাঁর।
অভিষেকের পরপরই তিনি দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করেন এবং অভিনয় করেন একাধিক আলোচিত ছবিতে, যেমন—“অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী”, “ইয়ে করে বিয়ে” “নালিশ” এই চলচ্চিত্রগুলোতে তাঁর অভিনয় তাঁকে বাংলাদেশের মূলধারার জনপ্রিয় নায়কদের কাতারে নিয়ে আসে।
অভিনয়জীবন:
নায়ক উজ্জ্বল প্রায় ১০০টিরও বেশি চলচ্চিত্র এবং সমসংখ্যক টেলিভিশন নাটকে অভিনয় করেছেন। তিনি কাজ করেছেন বাংলাদেশের কিংবদন্তি অভিনেত্রীদের সঙ্গে, যেমন—কবরী, ববিতা, শাবানা প্রমুখ।
তার অভিনয়ের বৈশিষ্ট্য ছিল সংযত আবেগ, সংলাপের দৃঢ়তা এবং চরিত্রের বাস্তব উপস্থাপন। বিশেষ করে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের গল্পে তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য।
প্রযোজক ও পরিচালক হিসেবে:
অভিনয়ের পাশাপাশি উজ্জ্বল নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি প্রযোজনা ও পরিচালনায়ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাঁর পরিচালিত ও প্রযোজিত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র—”আমির ফকির”, “উসিলা”, “নসীব” প্রভৃতি। এগুলোতে তিনি সমাজ-সচেতন বার্তা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।
উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র:
বিনিময় (১৯৭০) — প্রথম চলচ্চিত্র, মেঘের পরে মেঘ, অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী (১৯৭২), কাঁচের স্বর্গ, লালন ফকির, সমাধান, স্বীকৃতি, ইয়ে করে বিয়ে (১৯৭৩), দুটি মন দুটি আশা, পায়ে চলার পথ, বলাকা মন, শনিবারের চিঠি (১৯৭৪), ধন্যি মেয়ে (১৯৭৫), গড়মিল (১৯৭৬), সমাধি, অনুভব (১৯৭৭), দম মারো দম, পিঞ্জর, রূপালি সৈকতে, অগ্নিশিখা (১৯৭৮), অচেনা অতিথি, দাবি, বন্ধু, ফকির মজনু শাহ, মহেশ খালীর বাঁকে, অনুরাগ (১৯৭৯), বেলা শেষের গান, এখনই সময় (১৯৮০), জনতা এক্সপ্রেস (১৯৮১), নালিশ (১৯৮২), লাল কাজল, কুদরত, নিজেরে হারায়ে খুঁজি, অপবাদ, অপরাধ, বাংলার মুখ, বেদ্বীন, দোস্তী, আমির ফকির (প্রযোজিত), উসিলা, নসিব (প্রযোজিত), ঘর-সংসার, কারণ, নিয়ত, বিশাল, চোর ডাকাত পুলিশ, চিটার নাম্বার ওয়ান, রাজ সিংহাসন, বীরাঙ্গনা সখিনা (১৯৮৯), নালিশ (১৯৯০ সংস্করণ), জান আমার জান (২০০৯), সবার উপরে তুমি (২০০৯), ওয়ান্টেড (২০১১), কিং খান (২০১১), ডন নাম্বার ওয়ান (২০১২), দুর্ধর্ষ প্রেমিক (২০১২), বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না (২০১২), রাজা সূর্য খাঁ (২০১২), কঠিন প্রতিশোধ (২০১৪), হিরো: দ্য সুপারস্টার (২০১৪), রাজা বাবু (২০১৫), শাহেনশাহ (২০২০)।
উজ্জ্বল মূলত ৭০–৮০ দশকের জনপ্রিয় নায়ক হলেও পরে চরিত্রাভিনেতা হিসেবেও সফল হন। বিশেষ করে নালিশ ও অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী-এর মতো চলচ্চিত্র তাঁর ক্যারিয়ারের মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।
সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা:
নায়ক উজ্জ্বল শুধু শিল্পী নন, তিনি সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও সক্রিয় ছিলেন। তিনি চলচ্চিত্র প্রযোজক ও পরিবেশক সমিতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সেন্সর বোর্ডের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি তিনি রাজনৈতিকভাবেও সক্রিয় ছিলেন এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। বর্তমানে তিনি জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন৷
জন্মদিনের তাৎপর্য:
আজ তাঁর জন্মদিনে চলচ্চিত্রপ্রেমীরা স্মরণ করেন সেই সময়কে, যখন বাংলা সিনেমা ছিল গল্পনির্ভর, চরিত্রনির্ভর এবং আবেগে ভরপুর। উজ্জ্বল সেই সময়ের একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি—যিনি অভিনয়ের মাধ্যমে সমাজের নানা বাস্তবতা তুলে ধরেছেন।
শেষ কথা:
নায়ক উজ্জ্বল শুধুমাত্র একজন অভিনেতা নন—তিনি একটি যুগের প্রতীক। তাঁর জন্মদিন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, চলচ্চিত্র কেবল বিনোদন নয়, এটি সমাজের প্রতিচ্ছবি। তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন এবং অবদান বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে।
শুভ জন্মদিন, নায়ক উজ্জ্বল।
আপনার শিল্পভুবন বাংলা চলচ্চিত্রকে আরও বহুদিন আলোকিত করুক।