
ঝিকরগাছা (যশোর) প্রতিনিধি: যশোরের ঝিকরগাছায় অন্তঃসত্ত্বা বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী কিশোরী(২৫)’র জোরপূর্বক গর্ভপাত ঘটনোর ঘটনায় এলাকাবাসীর মাঝে তীব্র নিন্দা ক্ষোভের পাশাপাশি ব্যাপক চাঞ্চলের সৃষ্টি হয়েছে।
ন্যাক্কারজনক এই ঘটনায় জড়িত মানুষরূপী নরপশু দুই সন্তানের জনক হায়দার আলী (৪৫)ঘটনা জানাজানির পর থেকে পলাতক রয়েছে। একটি বেসরকারি ক্লিনিকে গর্ভপাত ঘটানোর গোপন চুক্তির ১লাখ ২০হাজার টাকার মধ্যে ৮০হাজার বকেয়া টাকা দিতে অস্বীকার করায় ঘটনাটি কানাঘুষার এক পর্যায়ে গ্রামবাসীর মাঝে প্রকাশ্যে চলে আসে। শুরু হয় গ্রাম্য সালিশের নামে দেনদরবার। দরকষাকষির এক পর্যায়ে দুই গ্রুপের মধ্যে হাতাহাতি মারামারির মতো ঘটনাও ঘটে।
চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি ঘটেছে ঝিকরগাছা উপজেলার নিভৃতপল্লী বাঁকড়া ইউনিয়নের দিগদানা মন্দির পাড়া গ্রামে।
হতভাগী প্রতিবন্ধী কিশোরীর ‘মা,ছবি বেগম (৫৫) অভিযুক্তকে গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।
ভিকটিমের মা ছবি বেগমের তিন সন্তানের মধ্যে প্রতিবন্ধী কিশোরী মেয়েসহ বড় ছেলেটিও বুদ্ধি প্রতিবন্ধী!
ঘটনার বিবরণ দিয়ে তিনি আক্ষেপ করে বলেন,লম্পট হায়দার আমার নিকট আত্মীয়। পরিচয় দিতে লজ্জা করে। আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি আমার বোবা মেয়ের সহজ-সরলতার সুযোগ নিয়ে এত বড় সর্বনাশ করবে।
জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, কিছুদিন আগে আমার মেয়ের শারীরিক অবস্থার অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করি। বাঁকড়া বাজারের একতা মেডিকেল সার্ভিসে আল্ট্রাসনো করার পর ডাক্তাররা আমাকে জানায় সালমা প্রায় চার মাসের গর্ভবতী। এ পর্যায়ে সে আমাকে আকার ইঙ্গিতে হায়দারকে অভিযোগ করে। বিষয়টি আশপাশের জ্ঞাতিগোষ্ঠী ও প্রতিবেশীরাও কানাঘুষা ও সন্দেহ করতে থাকে। একদিকে হায়দারের চাপাচাপি অন্যদিকে লোকলজ্জার ভয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দিতে তাকে ক্লিনিকে নিয়ে গর্ভপাত ঘটানোয় রাজি হয়ে যাই। তিনি করুন আকুতি জানিয়ে বলেন “আমার কেউ নেই, বিচার চাওয়ার জায়গাও নেই। আপনাদের কাছে বিচার চাই”।
নিন্দনীয় এই ঘটনার বিচার দাবি করেছেন ভিকটিমের নিকট প্রতিবেশী ও গ্রামবাসীরা।
ভিকটিম সালমা বেগম লম্পট হায়দার আলীর আপন চাচাতো বোনের মেয়ে। সম্পর্কে সে হয় সালমার মামা!
শনিবার (২২আগস্ট) সকালে সরেজমিন এ প্রতিবেদকের সাথে কথা হয়, দিকদানা মন্দির পাড়ার কপোতাক্ষ সাঁকো পাড়ের চা দোকানী চল্লিশোর্ধ আমির আলী,নিকট প্রতিবেশী ষাটোর্দ্ধ নজরুল ইসলাম,ভিকটিমের খালা শাহিদা বেগম (৩৫),ভিকটিমের খালু নজরুল ইসলাম (৪৫)আবুল কালাম (৫৫),জাকারিয়া (৪০)সহ অনেকের সাথে। অভিযুক্ত হায়দারের আপন চাচতো ভাই ইয়াকুব আলী (৪৮) ঘটনার তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করে বলেন, ‘সে আমার ভাই হলেও আমি অভিযুক্তর বিচার চাই। ও একটা অমানুষ, ওর বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ’।
অভিযোগের সত্যতা জানতে বাঁকড়া বাজারের একতা মেডিকেল সার্ভিসের পরিচালক আরিফ বিল্লাহর সাথে কথা হয়। তিনি তার ক্লিনিকে অবৈধ কোন গর্ভপাত ঘটানোর ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা রয়েছে দাবি করে বলেন,গত ২৯জুলাই বেলা ১১টায় তার ক্লিনিকে সালমা নামে এক রোগীকে আল্ট্রাসনোগ্রাম করানো হয়। এখানে কর্মরত গাইনি রোগীর চিকিৎসায় অভিজ্ঞ ডা: ফেরদৌস ফারজানা তাকে আলট্রাসনোগ্রাম করেন।পরীক্ষায় সালমা চার মাস দশ দিনের অন্তঃসত্তা বলে নিশ্চিত হন ডাক্তার। কিন্তু, তার স্বামী না থাকায় কিশোরী মাতাকে গর্ভপাত ঘটানোর তাদের পক্ষে সম্ভব নয় বলে জানিয়ে দেন। একই সাথে তার শারীরিক সুস্থতায় কিছু পরামর্শ দিয়ে বিদায় করা হয়। অন্তঃসত্ত্বার গর্ভপাতের ঘটনার সাথে তার ক্লিনিকের কেউ জড়িত নয় বলে দাবি করেন তিনি।
এদিকে ভিকটিমের মায়ের অভিযোগে জানা যায়, একতা ক্লিনিকে কর্মরত নার্স খাদিজা বেগম পরে ওই ভিকটিম ও তার মায়ের সাথে নিয়ে শার্শা উপজেলার বাগআঁচড়ার পার্শ্ববর্তী সাতমাইল বাজারের পার্শ্ববর্তী ‘মাতৃসেবা’ ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মোটা অংকের অর্থের চুক্তিতে প্রতিবন্ধী কিশোরী মাতা সালমার গর্ভপাত ঘটানো হয়।
এ ব্যাপারে বেসরকারি মাতৃসেবা ক্লিনিকের পরিচালক ধাত্রীবিদ্যায় ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারী নাসরিন সুলতানা তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি ক্যামেরার সামনে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করে দাম্ভিকতার সাথে বলেন,”আমি কারো কাছে ডকুমেন্টারি কথা বলতে রাজি নই”। তাঁর ক্লিনিক চেম্বারের টেবিলে রাখা নেম প্লেটে লেখা ডা: নাসরিন হক (এস.এম.এফ.বি) তাঁর নামের আগে ডাক্তার লেখার সুযোগ আছে কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি ছিলেন নিরুত্তর।
এ ব্যাপারে বাঁকড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ কাজী মো: শহিদুল ইসলামের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, এমন কোন ঘটনা তার জানা নেই। অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান তিনি। বাঁকড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাস্টার আনিস উর রহমান বলেন, একজন অসহায় প্রতিবন্ধী কিশোরীর প্রতি এমন জঘন্য ও পৈশাচিক ঘটনা মেনে নেয়া যায়না।