
চলচ্চিত্র সাংবাদিক ফাহিম শাহরিয়ার রুমি – বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে এমন কিছু চলচ্চিত্র আছে, যেগুলো কেবল একটি গল্পের সীমারেখায় আবদ্ধ নয়; বরং একটি জাতির রাজনৈতিক বাস্তবতা, সংগ্রাম ও চেতনার প্রতীক হয়ে উঠেছে। সেই ধরনের চলচ্চিত্রের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো জীবন থেকে নেয়া। ১৯৭০ সালে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটির পরিচালক ছিলেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান। এটি শুধু একটি চলচ্চিত্র নয়, বরং বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের পূর্ব মুহূর্তের রাজনৈতিক পরিস্থিতির এক শক্তিশালী শিল্পরূপ। চলচ্চিত্রটির মূল কাহিনি একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের ভেতরের সম্পর্ক ও দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। পরিবারের কেন্দ্রীয় চরিত্র হলো এক কর্তৃত্বপরায়ণ বড় বোন, যার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন রওশন জামিল। তিনি পরিবারের উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন এবং তার স্বামী ও ছোট ভাইবোনদের উপর এক ধরনের স্বৈরাচারী ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। এই পরিবারে আরও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন খান আতাউর রহমান, রাজ্জাক, সুচন্দা, শওকত আকবর, রোজী সামাদ এবং আনোয়ার হোসেন, বেবী জামান, আমজাদ হোসেন, ব্লাক আনোয়ার সহ অনেকে।

প্রথম দৃষ্টিতে চলচ্চিত্রটি একটি পারিবারিক নাটক বলে মনে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক রূপক। জহির রায়হান এখানে একটি পরিবারের গল্পের মাধ্যমে আসলে তৎকালীন পাকিস্তানি শাসনব্যবস্থার প্রতীকী চিত্র তুলে ধরেছেন। বড় বোনের স্বৈরাচারী আচরণ যেন পূর্ববাংলার মানুষের উপর পশ্চিম পাকিস্তানের শাসনের প্রতীক। পরিবারের অন্য সদস্যদের দমিয়ে রাখা, স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া এবং প্রতিনিয়ত নিয়ন্ত্রণ আরোপ—এসবই তখনকার রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। চলচ্চিত্রটির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো এর প্রতীকী ভাষা। জহির রায়হান অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পারিবারিক ঘটনাগুলোকে রাজনৈতিক রূপকের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, পরিবারের সদস্যরা যখন ধীরে ধীরে বড় বোনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করে, তখন সেটি যেন পূর্ববাংলার মানুষের রাজনৈতিক জাগরণের প্রতীক হয়ে ওঠে। এই চলচ্চিত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য একটি বিষয় হলো গণসংগীতের ব্যবহার। চলচ্চিত্রে বিভিন্ন দৃশ্যে সেই সময়ের জনপ্রিয় আন্দোলনের গান ব্যবহার করা হয়েছে, যা দর্শকের মনে তৎকালীন রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সংগ্রামের আবহ তৈরি করে। এসব গানের মাধ্যমে চলচ্চিত্রটি শুধু একটি নাট্যকাহিনি নয়, বরং একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের সাংস্কৃতিক দলিল হয়ে উঠেছে। চলচ্চিত্রটির নির্মাণশৈলীও বিশেষভাবে বিশ্লেষণযোগ্য। জহির রায়হান অত্যন্ত সচেতনভাবে ক্যামেরার ব্যবহার করেছেন।

অনেক দৃশ্যে দেখা যায়, বড় বোনকে ফ্রেমের কেন্দ্রে এবং অন্য চরিত্রগুলোকে ফ্রেমের প্রান্তে রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে তার ক্ষমতা ও আধিপত্যকে দৃশ্যগতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। আবার যখন পরিবারের সদস্যরা তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করে, তখন ফ্রেমের বিন্যাসেও পরিবর্তন দেখা যায়—যা প্রতিরোধের প্রতীক। চলচ্চিত্রটির সংলাপও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অনেক সংলাপ সরাসরি রাজনৈতিক বক্তব্যের মতো শোনালেও তা কখনও কৃত্রিম মনে হয় না। বরং পারিবারিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই সেগুলো স্বাভাবিকভাবে উঠে এসেছে। এই সংলাপগুলোই চলচ্চিত্রটিকে একটি রাজনৈতিক রূপকের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। জহির রায়হানের চলচ্চিত্র নির্মাণের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল বাস্তবতার সঙ্গে শিল্পরূপের সমন্বয়। “জীবন থেকে নেয়া”-তে তিনি এই কৌশলকে অত্যন্ত সফলভাবে প্রয়োগ করেছেন। একদিকে চলচ্চিত্রটি বাস্তবধর্মী পারিবারিক নাটক, অন্যদিকে এটি একটি রাজনৈতিক উপমা। এই দ্বৈত স্তরের নির্মাণই চলচ্চিত্রটিকে গভীরতা দিয়েছে। চলচ্চিত্রটির নারী চরিত্রগুলোর বিশ্লেষণও গুরুত্বপূর্ণ। বড় বোন চরিত্রটি একদিকে স্বৈরাচারী ক্ষমতার প্রতীক হলেও অন্যদিকে সে একটি জটিল মনস্তাত্ত্বিক চরিত্র। তার আচরণে কখনও ভয়, কখনও সন্দেহ এবং কখনও অসহায়তা দেখা যায়। এই বহুমাত্রিকতা চরিত্রটিকে আরও বাস্তব ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে। একই সঙ্গে চলচ্চিত্রে ছোট বোন চরিত্রটি স্বাধীনতা ও মুক্তির প্রতীক হিসেবে উপস্থিত। তার প্রতিবাদী মনোভাব এবং সাহসিকতা যেন তৎকালীন তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক চেতনার প্রতিফলন।
চলচ্চিত্রটির শেষাংশ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। পরিবারের সদস্যরা যখন একত্রিত হয়ে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তখন সেটি কেবল একটি পারিবারিক সংঘর্ষ নয়; বরং একটি জাতির মুক্তির আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে ওঠে। এই সমাপ্তি দর্শকের মনে এক ধরনের আশাবাদ সৃষ্টি করে—যেন অবশেষে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের জয় হবেই। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে “জীবন থেকে নেয়া” একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত। এটি শুধু শিল্পগত দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং রাজনৈতিক সাহসিকতার জন্যও বিশেষভাবে স্মরণীয়। পাকিস্তানি শাসনামলের শেষদিকে এমন একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করা ছিল অত্যন্ত সাহসী পদক্ষেপ। অনেক চলচ্চিত্র সমালোচকের মতে, “জীবন থেকে নেয়া” বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক চলচ্চিত্রগুলোর একটি। এটি প্রমাণ করে যে, চলচ্চিত্র কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়; বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে প্রকাশ করার শক্তিশালী শিল্পমাধ্যমও হতে পারে। জহির রায়হানের চলচ্চিত্রজীবন ছিল তুলনামূলকভাবে স্বল্প সময়ের, কিন্তু তার কাজের প্রভাব অত্যন্ত গভীর।

তিনি বাংলা চলচ্চিত্রকে কেবল বাণিজ্যিক বিনোদনের গণ্ডি থেকে বের করে একটি সচেতন শিল্পমাধ্যমে রূপ দিতে চেয়েছিলেন। “জীবন থেকে নেয়া” সেই প্রচেষ্টারই সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ। সবশেষে বলা যায়, “জীবন থেকে নেয়া” কেবল একটি চলচ্চিত্র নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক দলিল। এই চলচ্চিত্র আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, স্বাধীনতার সংগ্রাম কেবল রাজনৈতিক নেতাদের কাজ নয়—এটি সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। জহির রায়হান তাঁর অসাধারণ শিল্পদৃষ্টি ও সাহসিকতার মাধ্যমে সেই সত্যকেই চলচ্চিত্রের ভাষায় অমর করে গেছেন।