
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি : বিশ্বসংগীতের ইতিহাসে যাঁরা পূর্ব ও পাশ্চাত্যের সেতুবন্ধন তৈরি করেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন রবি শঙ্কর। তাঁর জন্মদিন ৭ এপ্রিল উপলক্ষে এই কিংবদন্তি শিল্পীর জীবন, সাধনা ও অবদানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানানো হয়।
জন্ম ও শৈশবঃ
পণ্ডিত রবি শঙ্করের জন্ম ৭ এপ্রিল ১৯২০ সালে ভারতের বারাণসীতে (তৎকালীন বেনারস) এক বাঙালি ব্রাহ্মণ পরিবারে। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল রবীন্দ্র শঙ্কর চৌধুরী। শৈশবে তিনি তাঁর বড় ভাই উদয় শঙ্কর-এর নৃত্যদলে যোগ দিয়ে ইউরোপ ও ভারতের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করেন।
সংগীতে দীক্ষাঃ
১৮ বছর বয়সে নৃত্যজীবন ছেড়ে তিনি সম্পূর্ণভাবে সংগীতে মনোনিবেশ করেন। এরপর প্রায় সাত বছর ধরে তিনি বিখ্যাত গুরু আলাউদ্দিন খান-এর কাছে সেতার শিক্ষা গ্রহণ করেন। এই কঠোর সাধনাই তাঁকে পরবর্তীতে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেতারবাদক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
সংগীতজীবন ও বিশ্বজয়ঃ
রবি শঙ্কর ছিলেন হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের সর্বাধিক পরিচিত প্রতিনিধি। তিনি শুধু ভারতেই নয়, ইউরোপ ও আমেরিকায় ভারতীয় সংগীতকে জনপ্রিয় করে তোলেন। ১৯৫০-এর দশক থেকে তিনি আন্তর্জাতিক সফর শুরু করেন এবং পশ্চিমা শ্রোতাদের কাছে ভারতীয় রাগসংগীতকে পৌঁছে দেন।
তিনি কিংবদন্তি বেহালাবাদক ইহুদি মেনুহিন এবং দ্য বিটলস ব্যান্ডের সদস্য জর্জ হ্যারিসন-এর সঙ্গে কাজ করে বিশ্বসংগীতে নতুন মাত্রা যোগ করেন। তাঁর এই সহযোগিতার ফলে পশ্চিমা পপ ও রক সংগীতে ভারতীয় বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
চলচ্চিত্র ও সৃজনশীলতাঃ
রবি শঙ্কর শুধু মঞ্চশিল্পীই নন, একজন সফল সুরকারও ছিলেন। তিনি সত্যজিৎ রায়-এর বিখ্যাত “অপুর ট্রিলজি”সহ বিভিন্ন চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা করেন। এছাড়া “Gandhi” (১৯৮২) চলচ্চিত্রের সংগীতেও তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য।
পুরস্কার ও সম্মাননাঃ
তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য তিনি বহু আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেন। এর মধ্যে রয়েছে একাধিক গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড এবং ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘ভারতরত্ন’।
ব্যক্তিজীবনঃ
রবি শঙ্করের কন্যাদের মধ্যে নোরা জোন্স এবং অনুষ্কা শঙ্কর বিশ্বসংগীতে নিজ নিজ ক্ষেত্রে খ্যাতি অর্জন করেছেন।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
২০১২ সালের ১১ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তবে তাঁর সংগীত, সৃষ্টিশীলতা এবং বিশ্বসংগীতে ভারতীয় ধ্রুপদী সংগীতের প্রসারে তাঁর ভূমিকা আজও অম্লান।
শেষ কথাঃ
রবি শঙ্কর শুধু একজন শিল্পী নন, তিনি ছিলেন এক সাংস্কৃতিক দূত—যিনি সেতারের সুরে ভারতীয় সংগীতকে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করা মানে সংগীতের এক স্বর্ণযুগকে শ্রদ্ধা জানানো।