
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি কৌতুক অভিনেতা আনিসুর রহমান আনিস-এর মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০১৯ সালের ২৮ এপ্রিল তিনি ঢাকার টিকাটুলির নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর।
শৈশব থেকে চলচ্চিত্রজীবন:
১৯৪০ সালে ব্রিটিশ ভারতের জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণ করেন আনিস। পরবর্তীতে তাঁর পারিবারিক শিকড় ছিল ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া অঞ্চলে।
চলচ্চিত্রে তাঁর যাত্রা শুরু হয় ১৯৬০ সালে ‘বিষকন্যা’ ছবির মাধ্যমে, যদিও সেটি মুক্তি পায়নি। পরে ১৯৬৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘এই তো জীবন’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি দর্শকদের সামনে আসেন এবং ধীরে ধীরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
কৌতুক অভিনয়ের স্বর্ণযুগ:
আনিস ছিলেন এমন একজন অভিনেতা, যিনি সংলাপ, শরীরী ভাষা ও সময়জ্ঞান—এই তিনের সমন্বয়ে এক অনন্য কৌতুকধারা তৈরি করেছিলেন। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ২৫০টিরও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন।
চলচ্চিত্রের পাশাপাশি টেলিভিশন ও মঞ্চেও তিনি সমানভাবে জনপ্রিয় ছিলেন। বিশেষ করে নাটক ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’-তে গোলাম হোসেন চরিত্রে তাঁর অভিনয় আজও স্মরণীয় হয়ে আছে।
উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র:
বিষকন্যা (মুক্তি পায়নি), এই তো জীবন (১৯৬৪), পয়সে / পয়সা (Paisay), মালা (১৯৬৫), জারিনা সুন্দরী, জংলি মেয়ে (১৯৬৭, চেনা অচেনা (১৯৬৮), মধুমালা (১৯৬৮), রূপবান রূপকথা, রাখালবন্ধু, পায়েল (১৯৭০) পুরস্কার, নির্দোষ, সানাই, ভানুমতী, সূর্য ওঠার আগে, ঘর সংসার, অধিকার, উজান ভাটি, তালাক, বারুদ, অঙ্গার, লাল কাজল, এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী (১৯৮০), সেতু বন্ধন, হিরো (১৯৮৮), পদ্মা নদীর মাঝি (১৯৯২), শেষ দিকের কাজ, যেমন জামাই তেমন বউ (শেষ চলচ্চিত্র) প্রভৃতি৷
গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ:
তিনি মূলত সহ-অভিনেতা ও কৌতুক চরিত্রে অভিনয় করতেন।
গ্রামীণ লোককাহিনীভিত্তিক চলচ্চিত্র (রূপবান, মধুমালা) থেকে শুরু করে সামাজিক ও বাস্তবধর্মী সিনেমা (পদ্মা নদীর মাঝি)—সব ধরনের ধারায় কাজ করেছেন।
তাঁর অভিনয়ের প্রধান শক্তি ছিল টাইমিং, সংলাপের ছন্দ এবং শরীরী ভাষা, যা তাঁকে ৬০–৯০ দশকের চলচ্চিত্রে একটি অপরিহার্য মুখে পরিণত করে।
মৃত্যু ও শেষ বিদায়:
২০১৯ সালের ২৮ এপ্রিল রাতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পরদিন ঢাকায় জানাজা শেষে তাঁর মরদেহ নিজ গ্রাম ফেনীতে নিয়ে দাফন করা হয়।
বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় তিনি ভুগছিলেন বলে জানা যায়।
শিল্পী হিসেবে মূল্যায়ন:
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে কৌতুক অভিনয়ের যে ধারাটি টেলি সামাদ, দিলদারদের মাধ্যমে জনপ্রিয় হয়েছিল, সেখানে আনিস ছিলেন এক অনিবার্য নাম। তাঁর অভিনয়ে ছিল গ্রামীণ সরলতা, শহুরে বুদ্ধিদীপ্ততা এবং জীবনের হাসি-কান্নার মিশ্র প্রতিফলন।
একজন শিল্পী হিসেবে তিনি শুধু হাসির খোরাক জোগাননি—বরং সমাজের নানা অসঙ্গতিকে কৌতুকের আড়ালে তুলে ধরেছেন।
স্মরণে আনিস:
মৃত্যুর বহু বছর পরও বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শকদের কাছে তিনি রয়ে গেছেন এক চিরচেনা মুখ—যার উপস্থিতি মানেই হাসি, স্বস্তি ও বিনোদন।
তার মৃত্যুবার্ষিকীতে চলচ্চিত্রপ্রেমীরা আজও স্মরণ করেন সেই মানুষটিকে, যিনি নিজের হাসি দিয়ে হাজারো মানুষের জীবনকে মুহূর্তের জন্য হলেও আনন্দময় করে তুলেছিলেন।