
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: আজ ৯ জুন, ভারতীয় চলচ্চিত্রের বিশিষ্ট পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার Satyen Bose-এর মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৯৩ সালের এই দিনে তিনি মুম্বাইয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বাংলা ও হিন্দি—উভয় ভাষার চলচ্চিত্রে তাঁর অবদান ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে।
১৯১৬ সালের ২২ জানুয়ারি কলকাতায় জন্মগ্রহণকারী সত্যেন বসু চলচ্চিত্র নির্মাণের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করেননি। তবুও নিজের প্রতিভা, পর্যবেক্ষণশক্তি এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রে একটি স্বতন্ত্র ভাষা নির্মাণ করেছিলেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি বিভিন্ন পেশায় যুক্ত থাকলেও নাট্যচর্চা ও শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি গভীর আগ্রহ তাঁকে শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্র জগতে নিয়ে আসে।
১৯৪৯ সালে তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র ‘পরিবর্তন’ (Paribartan) মুক্তি পায়। শিশু ও কিশোর মনস্তত্ত্বভিত্তিক এই চলচ্চিত্রটি সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পরে তিনি একই গল্প অবলম্বনে হিন্দিতে নির্মাণ করেন ‘জাগৃতি’ (Jagriti), যা ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষামূলক চলচ্চিত্র হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। ছবিটি ১৯৫৬ সালে ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে।
সত্যেন বসুর পরিচালিত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো ‘চলতি কা নাম গাড়ি’ (১৯৫৮), ‘দোস্তি’ (১৯৬৪), ‘রাত অউর দিন’ (১৯৬৭), ‘জীবন মৃত্যু’ (১৯৭০) এবং ‘বন্দি’ (১৯৫৭)। তাঁর নির্মিত ‘দোস্তি’ চলচ্চিত্রটি বন্ধুত্ব, মানবতা ও সংগ্রামের এক অসাধারণ কাহিনি হিসেবে দর্শকদের হৃদয়ে স্থায়ী স্থান করে নিয়েছে। এই ছবিটিও ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে।
সত্যেন বসুর চলচ্চিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক সচেতনতা এবং সহজ অথচ হৃদয়স্পর্শী গল্প বলার ক্ষমতা। তিনি বাণিজ্যিক সাফল্য ও শিল্পমান—এই দুইয়ের মধ্যে একটি ভারসাম্য রক্ষা করতে পেরেছিলেন। তাঁর ছবিতে সমাজের প্রান্তিক মানুষ, শিশু, বন্ধুত্ব, পরিবার এবং নৈতিক মূল্যবোধ বারবার ফিরে এসেছে।
বাংলা চলচ্চিত্রেও তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। ‘বরযাত্রী’, ‘ভোর হয়ে এলো’, ‘রিকশাওয়ালা’ প্রভৃতি চলচ্চিত্রে তিনি বাঙালি সমাজজীবনের নানা দিক তুলে ধরেছেন। তাঁর নির্মাণশৈলীতে বাস্তবতা, রসবোধ এবং মানবিক সংবেদনশীলতার সুন্দর সমন্বয় দেখা যায়। তিনি চলচ্চিত্রকে সমাজ ও মানুষের গল্প বলার শক্তিশালী শিল্পমাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোগুলো আজও নতুন প্রজন্মের দশক ও চলচ্চিত্র শিক্ষার্থীদের কাছে প্রাসঙ্গিক এবং অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে।
সত্যেন বসুকে তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা। তাঁর সৃষ্ট চলচ্চিত্র ও শিল্পদৃষ্টি ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।