
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: ভারতীয় উপমহাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে এক গভীর আবেগময় ধারার নির্মাতা হিসেবে স্মরণীয় নাম অসিত সেন। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী (২৫ আগস্ট) এলে চলচ্চিত্রপ্রেমীরা ফিরে তাকান সেই সময়ের দিকে, যখন গল্প, সংগীত ও মানবিক আবেগ মিলিয়ে সিনেমা হয়ে উঠত এক অনন্য শিল্পরূপ।
জন্ম ও শৈশব:
অসিত সেন জন্মগ্রহণ করেন ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯২২ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বিক্রমপুর অঞ্চলে (বর্তমান বাংলাদেশ)। শৈশব থেকেই শিল্প-সাহিত্য ও চিত্রকলার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল। পরবর্তীতে কলকাতায় পড়াশোনা করতে গিয়ে ফটোগ্রাফি ও চলচ্চিত্রের প্রতি আকৃষ্ট হন।
চলচ্চিত্রে তাঁর প্রবেশ ঘটে একজন সহকারী চিত্রগ্রাহক হিসেবে। পরে ধীরে ধীরে নিজস্ব ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তিনি পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
চলচ্চিত্রজীবন ও শিল্পভাবনা:
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্রে কাজ করে অসিত সেন নিজস্ব এক ধারা তৈরি করেন। তাঁর ছবিগুলো সাধারণত গভীর আবেগ, মানবিক টানাপোড়েন এবং সম্পর্কের সূক্ষ্মতা তুলে ধরার জন্য পরিচিত।
তাঁর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে—দীপ জ্বেলে যাই (১৯৫৯), উত্তর ফাল্গুনী (১৯৬৩), মমতা (১৯৬৬), আনোখি রাত (১৯৬৮), খামোশি (১৯৬৯), সফর (১৯৭০)।
বিশেষ করে দীপ জ্বেলে যাই এবং তার হিন্দি রিমেক খামোশি ভারতীয় চলচ্চিত্রে মনস্তাত্ত্বিক আবেগচিত্রণের এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

পুরস্কার ও স্বীকৃতি:
অসিত সেনের নির্মিত উত্তর ফাল্গুনী জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে। এছাড়া সফর ছবির জন্য তিনি ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ পরিচালকের পুরস্কার অর্জন করেন। তাঁর চলচ্চিত্রে সংগীত, অভিনয় এবং গল্পের মেলবন্ধন দর্শকদের মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে।
মৃত্যু:
২০০১ সালের ২৫ আগস্ট কলকাতায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর।
শেষ কথা:
অসিত সেন এমন এক নির্মাতা, যিনি মূলধারার সিনেমাকে মানবিক আবেগের গভীরতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর ছবিতে চোখের জল, ভালোবাসা, ত্যাগ—সবকিছুই ছিল জীবনের কাছাকাছি। সমসাময়িক সময়ের মহান নির্মাতাদের সঙ্গে তাঁর নামও সমান গুরুত্বে উচ্চারিত হতো।
আজকের দিনে যখন চলচ্চিত্রের ভাষা বদলে যাচ্ছে, তখনও অসিত সেনের কাজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সিনেমা শুধু বিনোদন নয়, এটি মানুষের ভেতরের অনুভূতির এক জীবন্ত দলিল।