
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: বিশ্ব বদলের হাতিয়ার, নাকি নতুন শঙ্কার কারণ?
স্টাফ রিপোর্টার: স্বাস্থ্য থেকে শিক্ষা, ব্যবসা থেকে বিনোদন—সবখানেই এআই-এর ব্যবহার বাড়ছে। তবে চাকরি, নৈতিকতা ও নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ। বাংলাদেশও এগোচ্ছে “স্মার্ট বাংলাদেশ” লক্ষ্য পূরণে।
বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (Artificial Intelligence) নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনার ঝড়। উন্নত প্রযুক্তির এই প্রয়োগ একদিকে মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ করছে, অন্যদিকে চাকরি, নৈতিকতা ও নিরাপত্তা নিয়ে বাড়াচ্ছে নানা শঙ্কা।
এআই বলতে এমন মেশিন বা সফটওয়্যারকে বোঝায়, যা মানুষের মতো চিন্তা, শেখা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখে। ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট, চ্যাটবট, ভাষা অনুবাদ, ছবি চেনা—এসব এখন আর কেবল গবেষণাগারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে।
স্বাস্থ্যখাতে রোগ নির্ণয়, ওষুধ তৈরি ও রোগীর তথ্য বিশ্লেষণে ব্যবহৃত হচ্ছে এআই। শিক্ষায় এসেছে ভার্চুয়াল টিউটর, ব্যবসায় গ্রাহকসেবা ও বাজার বিশ্লেষণে এর ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। এমনকি সিনেমার চিত্রনাট্য লেখা বা সংগীত তৈরিতেও এখন এআই ব্যবহৃত হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুব হাসান বলেন, “আগে যেসব কাজ করতে মানুষের কয়েক দিন লাগত, এখন এআই কয়েক মিনিটেই তা করে দিচ্ছে। এটি আমাদের জন্য বিশাল সুবিধা তৈরি করেছে।”
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, আগামী এক দশকে লক্ষাধিক চাকরি অটোমেশনের কারণে বিলীন হয়ে যেতে পারে। তবে নতুন প্রযুক্তি-ভিত্তিক চাকরিরও সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রাজধানীর একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত তরুণ কর্মকর্তা রুবাইয়া আক্তার বলেন, “আমরা কাজের জায়গায় এআই ব্যবহার করছি। এতে সময় বাঁচছে ঠিকই, কিন্তু কখনো মনে হয় ভবিষ্যতে হয়তো আমাদের কাজের প্রয়োজন কমে যাবে।”
ডিপফেক ভিডিও, ভুয়া ছবি বা মিথ্যা তথ্য প্রচারের কারণে এআই নিয়ে তৈরি হয়েছে নৈতিক প্রশ্ন। পাশাপাশি ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা ও সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ মো. তৌহিদুল ইসলাম বলেন, “যদি নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এআই ব্যবহার বাড়তে থাকে, তবে ভুয়া তথ্যের বিস্তার রোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই আন্তর্জাতিকভাবে সমন্বিত নীতিমালা তৈরি করা জরুরি।”
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ এআই নীতিমালায় অগ্রগামী। চীন দ্রুত এই প্রযুক্তিকে শিল্পে প্রয়োগ করছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো শিক্ষা ও কৃষিতে এআই ব্যবহার শুরু করেছে, যদিও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বাংলাদেশেও এআই ব্যবহার বাড়ছে। স্বাস্থ্যসেবা, ব্যাংকিং, ই-কমার্স ও শিক্ষা খাতে ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে এআই-নির্ভর সেবা। “স্মার্ট বাংলাদেশ” রূপকল্প বাস্তবায়নে সরকার এআই-কে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করছে।
তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এক অনুষ্ঠানে বলেন, “আমরা চাই এআই হোক উন্নয়নের হাতিয়ার। এআই যেন চাকরি কেড়ে না নেয়, বরং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে।”
বিশ্ব অর্থনীতিকে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলার সমৃদ্ধ করার সম্ভাবনা রয়েছে এআই-এর। তবে সঠিক নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এটি ভুয়া তথ্য, বৈষম্য ও বেকারত্বের মতো সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আজ শুধুই ভবিষ্যতের স্বপ্ন নয়, বরং বর্তমানের বাস্তবতা। সম্ভাবনার পাশাপাশি ঝুঁকিও বিরাট। তাই প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার, দায়িত্বশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধ রক্ষা করেই এআই-এর পথে এগিয়ে যেতে হবে।