
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে কৌতুক অভিনয়ের এক উজ্জ্বল নাম রবিউল আলম। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী এলে নতুন করে স্মরণ করা হয় সেই শিল্পীকে, যিনি স্বল্প সময়ের উপস্থিতিতেই দর্শকদের হাসির বন্যায় ভাসিয়ে দিতে পারতেন। বাংলা চলচ্চিত্রে কৌতুকের স্বর্ণযুগের অন্যতম নির্মাতা হিসেবে তিনি আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
জন্ম ও শৈশব: ১৯৩৯ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের সালার গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রবিউল। দেশভাগের পর তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং এখানেই তাঁর বেড়ে ওঠা। পেশাগত জীবনে তিনি টেলিফোন অ্যান্ড টেলিগ্রাফ (T&T)-এর একজন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন—যা তাঁর বহুমুখী প্রতিভার একটি দিক তুলে ধরে।
চলচ্চিত্রে পদার্পণ ও উত্থান: রবিউলের চলচ্চিত্র যাত্রা শুরু হয় ১৯৫৯ সালে ফতেহ লোহানী পরিচালিত আকাশ আর মাটি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। এরপর ধীরে ধীরে তিনি ঢালিউডে নিজস্ব একটি অবস্থান তৈরি করেন। তাঁর অভিনয়ের বৈশিষ্ট্য ছিল স্বতঃস্ফূর্ততা, সংলাপের সাবলীলতা এবং দেহভঙ্গির নিখুঁত ব্যবহার—যা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে যখন কৌতুক অভিনেতাদের আলাদা গুরুত্ব তৈরি হচ্ছিল, তখন রবিউল ছিলেন সেই ধারার অন্যতম পথিকৃৎ। পর্দায় তাঁর উপস্থিতি মানেই ছিল দর্শকদের নিশ্চিন্ত বিনোদন।
তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে: নীল আকাশের নিচে (১৯৬৯), চৌধুরী বাড়ি (১৯৭২), আলোর মিছিল (১৯৭৪), গুণ্ডা (১৯৭৬), ছুটির ঘন্টা (১৯৮০) প্রভৃতি৷
অভিনয়শৈলী ও অবদান: রবিউলকে অনেকেই “রসিকরাজ” নামে অভিহিত করেন। তাঁর অভিনয়ের প্রধান শক্তি ছিল পরিস্থিতিকে সহজভাবে হাস্যরসে রূপান্তর করার ক্ষমতা। সংলাপের পাশাপাশি মুখাভিনয় ও টাইমিং—এই তিনের নিখুঁত সমন্বয় তাঁকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যায়।
তিনি এমন এক সময় কাজ করেছেন, যখন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পে প্রযুক্তি ও প্রযোজনার সীমাবদ্ধতা ছিল। তবুও শুধুমাত্র অভিনয় দক্ষতার মাধ্যমে দর্শকদের মন জয় করা—এটাই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় সাফল্য।
মৃত্যু ও স্মরণ: ১৯৮৭ সালের ১৮ এপ্রিল ঢাকায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ৪৮ বছর।
অকালপ্রয়াণে চলচ্চিত্র অঙ্গন হারায় এক প্রতিভাবান শিল্পীকে, যার অভাব আজও অনুভূত হয়।
উত্তরাধিকার: রবিউলের পরবর্তী প্রজন্মের কৌতুক অভিনেতারা তাঁর অভিনয়ধারা থেকে প্রভাবিত হয়েছেন। তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলো আজও দর্শকের স্মৃতিতে জীবন্ত। বাংলা চলচ্চিত্রে কৌতুক অভিনয়ের যে স্বর্ণালী অধ্যায়—তার অন্যতম স্তম্ভ তিনি।
উপসংহার: মৃত্যুর এত বছর পরও রবিউল আলম কেবল একজন অভিনেতা নন, বরং এক যুগের প্রতিনিধিত্বকারী শিল্পী। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী আমাদের মনে করিয়ে দেয়—হাসি কখনো ক্ষণস্থায়ী নয়, যদি তা সত্যিকারের শিল্পীর হাতে সৃষ্টি হয়। তাঁর স্মৃতি ও কাজ বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে।