
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: আজ ১৮ এপ্রিল। এই দিনে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের এক গুণী অভিনেতা, গীতিকার ও সংস্কৃতিকর্মী শেখ আবুল কাশেম মিঠু। জন্মদিনে তাকে স্মরণ করা মানে কেবল একজন শিল্পীকে নয়, বরং একটি সময়কে, একটি চলচ্চিত্রধারাকে এবং এক বহুমাত্রিক সৃষ্টিশীল জীবনকে স্মরণ করা।
জন্ম ও শৈশব: শেখ আবুল কাশেম মিঠু ১৯৫১ সালের ১৮ এপ্রিল বর্তমান সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলার দরগাহপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা শেখ আবুল হোসেন এবং মাতা হাফেজা খাতুন। গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই শিল্পীর শৈশবেই শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি ঝোঁক তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে তার জীবনকে এক ভিন্ন ধারায় নিয়ে যায়।
শিক্ষাজীবন ও সাংস্কৃতিক চর্চা: তিনি খুলনা সিটি কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা শুরু করেন এবং পরবর্তীতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই লেখালেখি, সাংবাদিকতা ও নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত হন। বিভিন্ন পত্রিকায় গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধ লিখে তিনি সাহিত্য জগতেও পরিচিতি লাভ করেন।
চলচ্চিত্রে উত্থান: ১৯৮০-এর দশকে বাংলা চলচ্চিত্রে তার আবির্ভাব ঘটে। প্রথমদিকে ছোট চরিত্রে অভিনয় করলেও দ্রুতই তিনি দর্শকদের নজর কাড়েন। বিশেষ করে ‘বেদের মেয়ে জোৎস্না’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন এবং নিজেকে একজন শক্তিশালী অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে—বেদের মেয়ে জোৎস্না, প্রেম প্রতিজ্ঞা, ঈদ মোবারক, ভেজা চোখ, নিকাহ, কুসুমকলি, চাঁদের হাসি, নরম-গরম, গৃহলক্ষ্মী, অন্ধবধূ, স্যারেন্ডার, বাবা কেন চাকর, দস্যু রাণী ফুলন দেবী, চাকর প্রভৃতি।
চলচ্চিত্রে তার অভিনয় ছিল স্বতঃস্ফূর্ত, আবেগময় এবং বাস্তবধর্মী—যা তাকে সমসাময়িক অভিনেতাদের ভিড়েও আলাদা করে তুলেছিল।
বহুমাত্রিক প্রতিভা: শুধু অভিনেতা হিসেবেই নয়, শেখ আবুল কাশেম মিঠু ছিলেন একজন গীতিকার ও নাট্যকারও। বাংলাদেশ বেতার খুলনা কেন্দ্রে তিনি গীতিকার ও নাট্যকার হিসেবে কাজ করেছেন। এছাড়া বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি সাংস্কৃতিক আন্দোলনেও ভূমিকা রেখেছেন।
তার লেখা গান ও সাহিত্যকর্মে জীবনের গভীরতা, নৈতিকতা এবং আধ্যাত্মিকতার ছাপ পাওয়া যায়।
ব্যক্তিজীবন ও আদর্শ: ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন সৎ, নীতিবান এবং আদর্শিক। জীবনের শেষভাগে ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতি তার ঝোঁক আরও বৃদ্ধি পায়। সমাজে একজন নৈতিক মানুষ হিসেবে তিনি সম্মানিত ছিলেন।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার: ২০১৫ সালের ২৫ মে কলকাতায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি নানা জটিল রোগে ভুগছিলেন। তার মৃত্যু বাংলা চলচ্চিত্রাঙ্গনে এক অপূরণীয় শূন্যতা সৃষ্টি করে।
আজও তার অভিনয়, গান এবং সাংস্কৃতিক অবদান নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে যাচ্ছে।
উপসংহার: জন্মদিনে শেখ আবুল কাশেম মিঠু-কে স্মরণ করা মানে এক নিবেদিত শিল্পীর জীবনসংগ্রাম ও সৃজনশীলতার ইতিহাসকে স্মরণ করা। তিনি হয়তো আজ নেই, কিন্তু তার শিল্পকর্ম—চলচ্চিত্রের পর্দা, গানের সুর এবং লেখার ভেতর দিয়ে—বাংলা সংস্কৃতিতে চিরকাল বেঁচে থাকবেন।