
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি:আজ ২২ এপ্রিল—বাংলা চলচ্চিত্রের প্রথম নারী সুপারস্টারদের অন্যতম, কিংবদন্তি অভিনেত্রী ও গায়িকা কানন দেবী-এর জন্মদিন।
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে যে ক’জন শিল্পী সত্যিকার অর্থে “স্টারডম”-এর ধারণা প্রতিষ্ঠা করেছেন, তাদের মধ্যে কানন দেবী অগ্রগণ্য। ১৯১৬ সালের ২২ এপ্রিল ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির হাওড়ায় তাঁর জন্ম।
দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া জীবনই একসময় তাঁকে বাংলা চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছে দেয়—যা এক অর্থে “র্যাগস টু রিচেস” গল্পের বাস্তব উদাহরণ।
সংগ্রামময় শৈশব ও অভিনয়ে আগমন:
কানন দেবীর শৈশব ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। অল্প বয়সেই পিতার মৃত্যু ঘটে, ফলে মা-সহ তাঁকে অন্যের বাড়িতে কাজ করতে হয়েছে।
মাত্র ১০ বছর বয়সে তিনি চলচ্চিত্রে প্রবেশ করেন। ১৯২৬ সালে ‘জয়দেব’ ছবিতে ছোট চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তাঁর যাত্রা শুরু হয়।
প্রথমদিকে তিনি “কাননবালা” নামে পরিচিত ছিলেন। পরে ধীরে ধীরে “কানন দেবী” নামেই খ্যাতি অর্জন করেন।
নির্বাক যুগ থেকে সবাক চলচ্চিত্রে উত্থান:
বাংলা চলচ্চিত্র যখন নীরব যুগ থেকে সবাক যুগে প্রবেশ করছে, ঠিক সেই সন্ধিক্ষণেই কানন দেবীর আবির্ভাব। তাঁর অভিনয়ের পাশাপাশি কণ্ঠসঙ্গীত ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি।
১৯৩০ ও ৪০-এর দশকে তিনি নিউ থিয়েটার্স-এর মতো প্রতিষ্ঠানে কাজ করে অসংখ্য জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। তাঁর গানের দ্রুত তাল ও স্বতন্ত্র ভঙ্গি দর্শক-শ্রোতাদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
এই সময়েই তিনি বাংলা সিনেমার প্রথম নারী “স্টার” হিসেবে স্বীকৃতি পান।
স্টারডম ও সামাজিক প্রভাব:
কানন দেবী শুধু একজন অভিনেত্রী ছিলেন না—তিনি ছিলেন একটি সাংস্কৃতিক আইকন।
তাঁর পোশাক, স্টাইল, অভিনয়—সবকিছুই সাধারণ মানুষ অনুকরণ করত। এমনকি তাঁর ছবি রাস্তায় বিক্রি হতো, যা সেই সময়ের জন্য বিরল ঘটনা।
নারীদের পেশাজীবনে অংশগ্রহণ যেখানে সামাজিকভাবে নিরুৎসাহিত ছিল, সেখানে তিনি সাহসিকতার সঙ্গে নিজের অবস্থান তৈরি করেন। ফলে তিনি নারী স্বাধীনতা ও আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রতীক হয়ে ওঠেন।
উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র:
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কানন দেবী–এর চলচ্চিত্রভান্ডার অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও বিস্তৃত। নীরব যুগ থেকে সবাক চলচ্চিত্র—দুই সময়েই তিনি কাজ করেছেন। নিচে তাঁর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হলো—
নির্বাক যুগের চলচ্চিত্র (Silent Era):
জয়দেব (১৯২৬), বিষ্ণুমায়া (১৯২৭), রিশির প্রেম, শ্রীকৃষ্ণ, বিষবৃক্ষ, বিষ্ণুপ্রিয়া।
প্রারম্ভিক সবাক চলচ্চিত্র (Early Talkies):
জোর-ভাটা (১৯৩১), চার দরবেশ (১৯৩৩), মা (১৯৩৪), বাসবদত্তা (১৯৩৫), মনময়ী গার্লস স্কুল (১৯৩৫), বিদ্যাপতি (১৯৩৭), মুক্তি (১৯৩৭)।
নিউ থিয়েটার্স যুগ ও স্বর্ণালি সময়:
এই সময়েই তিনি সুপারস্টার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান—
সাথী (১৯৩৮), স্ট্রিট সিঙ্গার (১৯৩৮), সাপুরে (১৯৩৯), জীবন-মরণ (১৯৩৯), পরাজয় (১৯৪০), হারজিত (১৯৪০), অভিনেত্রী (১৯৪০), পরিচয় (১৯৪১), লেগে থাক (১৯৪১), শেষ উত্তর (১৯৪২)।
পরবর্তী সময়ের উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র:
জওয়ার ভাটা (১৯৪৪), বঙ্কিমচন্দ্র (১৯৪৭), অনির্বাণ (১৯৪৮), অশোক (১৯৪৮), অন্নপূর্ণা (১৯৪৯), মেজদিদি (১৯৫০)
বিশেষভাবে আলোচিত ও কালজয়ী চলচ্চিত্র:
নিচের চলচ্চিত্রগুলো তাঁকে কিংবদন্তির আসনে বসিয়েছে—
বিদ্যাপতি (১৯৩৭), মুক্তি (১৯৩৭), স্ট্রিট সিঙ্গার (১৯৩৮), অভিনেত্রী (১৯৪০), পরিচয় (১৯৪১), শেষ উত্তর (১৯৪২), মেজদিদি (১৯৫০)
সংগীতনির্ভর চলচ্চিত্র:
কানন দেবী–এর গায়কী তাঁর জনপ্রিয়তার অন্যতম প্রধান কারণ। বিশেষ করে—
স্ট্রিট সিঙ্গার, মুক্তি, বিদ্যাপতি, এই চলচ্চিত্রগুলোতে তাঁর কণ্ঠ দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
বিশ্লেষণ:
কানন দেবীর চলচ্চিত্র তালিকা শুধু সংখ্যার দিক থেকে নয়, গুণগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর কাজের মধ্য দিয়ে আমরা দেখতে পাই—
বাংলা সিনেমার নির্বাক যুগ থেকে সবাক যুগে রূপান্তর। নারী শিল্পীদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার পরিবর্তন। সংগীতনির্ভর চলচ্চিত্রের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি।
কানন দেবী–এর চলচ্চিত্রজীবন এক কথায় বাংলা সিনেমার বিবর্তনের ইতিহাস। তাঁর প্রতিটি চলচ্চিত্র যেন এক একটি সময়ের দলিল—যেখানে শিল্প, সমাজ ও সংস্কৃতি একসঙ্গে মিশে গেছে।
পুরস্কার ও সম্মাননা:
কানন দেবীর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বহু সম্মাননায় ভূষিত হন—
১৯৪২ ও ১৯৪৩: বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন (BFJA) পুরস্কার
১৯৬৮: পদ্মশ্রী
১৯৭৬: দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার (ভারতের চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ সম্মান)
জীবনের শেষ অধ্যায়:
দীর্ঘ অভিনয়জীবনের পর তিনি ধীরে ধীরে চলচ্চিত্র থেকে সরে দাঁড়ান। ১৯৯২ সালের ১৭ জুলাই কলকাতায় তাঁর মৃত্যু হয়।
তবে তাঁর রেখে যাওয়া শিল্পসাধনা আজও বাংলা চলচ্চিত্রের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।
বিশ্লেষণ: কেন কানন দেবী আজও প্রাসঙ্গিক?
কানন দেবীর গুরুত্ব শুধু ঐতিহাসিক নয়, নান্দনিকও—
তিনি বাংলা চলচ্চিত্রে “নারী স্টারডম” প্রতিষ্ঠা করেন
অভিনয় ও সংগীত—দুই ক্ষেত্রেই সমান দক্ষতা দেখান
সামাজিক বাধা ভেঙে নারী শিল্পীদের পথ খুলে দেন
আধুনিক বাংলা সিনেমার নান্দনিকতার ভিত্তি গড়ে দেন
তাঁর জীবন ও কর্ম আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শিল্প কেবল বিনোদন নয়, এটি সামাজিক পরিবর্তনের শক্তিশালী মাধ্যম।
শেষ কথা:
আজ তাঁর জন্মদিনে কানন দেবী-কে স্মরণ করা মানে শুধু একজন শিল্পীকে স্মরণ করা নয়, বরং বাংলা চলচ্চিত্রের শেকড়কে পুনরাবিষ্কার করা।
তিনি ছিলেন আলো—যে আলো আজও বাংলা সিনেমার পর্দায় প্রতিফলিত হয়।