
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: বাংলা সংস্কৃতির প্রগতিশীল ধারার অন্যতম প্রধান পুরুষ কলিম শরাফী-এর প্রয়াণ দিবস আজ। রবীন্দ্রসংগীত, গণসংগীত, রাজনৈতিক চেতনা, নাট্যআন্দোলন ও চলচ্চিত্রচর্চার সঙ্গে যাঁর নাম গভীরভাবে জড়িয়ে আছে, তিনি শুধু একজন শিল্পী নন—বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাঁর কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর গান পেয়েছিল নতুন আবেদন; একই সঙ্গে তিনি হয়ে উঠেছিলেন অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর।
১৯২৪ সালের ৮ মে বীরভূম জেলায় জন্মগ্রহণ করেন কলিম শরাফী। তাঁর পূর্ণ নাম ছিল মাখদুমজাদা শাহ সৈয়দ কলিম আহমেদ শরাফী। একটি পীর পরিবারে জন্ম হলেও ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ তৈরি হয়। পরবর্তীতে তিনি রবীন্দ্রসংগীত চর্চার মাধ্যমে উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন।
কৈশোরে তিনি যুক্ত হন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে। ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলন-এ অংশগ্রহণের কারণে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। কারাগারে থাকাকালীনই রবীন্দ্রসংগীতের প্রতি তাঁর আকর্ষণ আরও গভীর হয়। পরে তিনি যুক্ত হন ভারতীয় গণনাট্য সংঘের সঙ্গে এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে মানুষের মুক্তির সংগ্রামের অংশ হিসেবে দেখতেন।
কলিম শরাফীর শিল্পীজীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল পরিচয় তাঁর রবীন্দ্রসংগীত। “আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ”, “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে”, “পুরানো সেই দিনের কথা”—এসব গানে তাঁর কণ্ঠ আজও সমানভাবে অনুরণিত হয়। তাঁর গায়কীতে ছিল আবেগ, শুদ্ধ উচ্চারণ ও বোধের অনন্য সমন্বয়।
সংগীতের পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, তিনি ১৯৬২ সালে সোনার কাজল চলচ্চিত্রটি যৌথভাবে পরিচালনা করেন কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান-এর সঙ্গে। এটি ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের চলচ্চিত্র জগতের একটি উল্লেখযোগ্য কাজ। চলচ্চিত্রটিতে অভিনয় করেছিলেন খলিল উল্লাহ খান, সুলতানা জামান ও সুমিতা দেবী।
এছাড়া কখনো আসেনি চলচ্চিত্রের জন্য তিনি “কোন দূর বাতায়নে” গানটি রচনা করেছিলেন ও কন্ঠ দেন। চলচ্চিত্রটির পরিচালক ছিলেন জহির রায়হান।
চলচ্চিত্র ও গণমাধ্যমের সাংগঠনিক ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত তিনি পাকিস্তান টেলিভিশন কর্পোরেশন-এ প্রোগ্রাম ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। টেলিভিশনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নির্মাণ ও শিল্পী গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে স্মরণীয়।
কলিম শরাফী ছিলেন সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবেও অত্যন্ত প্রভাবশালী। তিনি বাংলাদেশ রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী সংস্থা-এর সভাপতি ছিলেন এবং ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন সংগীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান “সঙ্গীত ভবন”। তাঁর নেতৃত্বে প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলন নতুন গতি পায়।
সংগীত ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ১৯৮৫ সালে একুশে পদক এবং ১৯৯৯ সালে স্বাধীনতা পদক লাভ করেন। জীবনের শেষদিকে তিনি রবীন্দ্রসংগীত চর্চায় বিশেষ অবদানের জন্য রবীন্দ্র পুরস্কারেও সম্মানিত হন।
২০১০ সালের ২ নভেম্বর ঢাকা-য় নিজ বাসভবনে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁকে সমাহিত করা হয় মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থান-এ।
কলিম শরাফীর জন্মদিনে গভীর শ্রদ্ধা। তিনি এমন এক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, যিনি সংগীত, নাটক, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র—সব ক্ষেত্রেই প্রগতিশীল চেতনার আলো ছড়িয়ে গেছেন।