
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: মুক্তিযোদ্ধা, খ্যাতিমান অভিনেতা, চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, পরিবেশক, সঙ্গীত পরিচালক, গীতিকার ও কণ্ঠশিল্পী—বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী আজমল হুদা মিঠু বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতি অঙ্গনে এক উজ্জ্বল নাম। তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিকদের অন্যতম ছিলেন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়।
১৯৪৩ সালের ১৩ এপ্রিল বগুড়ায় তাঁর জন্ম। তাঁর বাবা মৌলভী কাজেব উদ্দিন আহমেদ ছিলেন একজন আইনজীবী এবং মা সালমা আক্তার খাতুন। পারিবারিক পরিবেশ থেকেই তিনি শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনস্ক হয়ে ওঠেন।
১৯৬৮ সালে তিনি চলচ্চিত্রে অভিনেতা হিসেবে যাত্রা শুরু করেন। তাঁর প্রথম অভিনীত চলচ্চিত্র ছিল আমজাদ হোসেন পরিচালিত ‘বাল্যবন্ধু’। এরপর তিনি আনাড়ি, পায়েল, বাবলু, কসম উসক্ ওয়াক্ত কি (নায়ক), স্মৃতিটুকু থাক, ঢেউয়ের পর ঢেউ, রং বদলায়, পীচ ঢালা পথ, ধীরে বহে মেঘনা (নায়ক), সংগ্রাম, রাতের পর দিন, বিজলী, চ্যালেঞ্জ, দোস্তী, আক্রোশ, আমিই ওস্তাদ, এরই নাম দোস্তীসহ অসংখ্য চলচ্চিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের হৃদয়ে জায়গা করে নেন। একজন শক্তিমান অভিনেতা হিসেবে তিনি ছিলেন সুপরিচিত।
শুধু অভিনয়েই সীমাবদ্ধ থাকেননি, তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণেও নিজস্ব স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁর কাহিনী, চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় নির্মিত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে—দোস্তী, আমিই ওস্তাদ (যেখানে তিনি সঙ্গীত পরিচালনাও করেন), চোর ডাকাত পুলিশ, অপরাধ জগতের রাজা, ঝন্টু মন্টু দুই ভাই।
প্রযোজক হিসেবেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সফল। তাঁর প্রযোজনায় নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—ধীরে বহে মেঘনা, বাদশা, দোস্তী, কালো গোলাপ, অগ্নিপরীক্ষা, নিয়তির খেলা, মিলন তারা, আমিই ওস্তাদ, চোর ডাকাত পুলিশ, সংসার সীমান্তে, দুখিনী বধূ, শয়তান যাদুকর, অপরাধ জগতের রাজা, এরই নাম দোস্তী, ঝন্টু মন্টু দুই ভাই। তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রযোজনা সংস্থা সালমা কথা চিত্র ও জয় বিজয় চলচ্চিত্র বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আজমল হুদা মিঠু শুধু নিজে সফল হননি, তিনি নতুন শিল্পী, কলাকুশলী ও পরিচালকদের কাজের সুযোগ করে দিয়ে চলচ্চিত্র শিল্পকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর সৃষ্টিশীল দৃষ্টিভঙ্গি ও উদ্যোগে অনেক নতুন প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পেয়েছে।
মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি স্বাধীনতাকামী শিল্পী-কলাকুশলীদের নিয়ে একটি শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তোলেন, যা মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষকে দেশের বাইরে বা মুক্তাঞ্চলে যেতে সহযোগিতা করত। এছাড়া স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ঐতিহাসিক নাটক ‘জল্লাদের দরবার’-এ তাঁর অভিনয় তাঁকে বিশেষ খ্যাতি এনে দেয়।
সঙ্গীত পরিচালক ও গীতিকার হিসেবেও তিনি স্মরণীয়। তাঁর সুরারোপিত জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে রয়েছে—
“তোমাদের পাশে এসে, বিপদের সাথী হতে আজকের চেষ্টা আমার…”,
“এ কি ভুল আমি করলাম…”,
“তুমি সন্ধ্যা আকাশের তারার মতো আমার মনে জ্বলবে…”,
“আমি যদি মেঘ হতাম…”,
“যদি জানতে চাও…”,
“ভালোবেসে সবারই তো ঘর বাঁধা হয় না…”।
২০১০ সালের ৩ জানুয়ারি তিনি শারীরিকভাবে আমাদের ছেড়ে চলে যান। কিন্তু তাঁর সৃষ্টিশীল কর্ম, চলচ্চিত্র ও সাংস্কৃতিক অবদান আজও আমাদের মাঝে জীবন্ত।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও চলচ্চিত্র শিল্পে তাঁর অবদান চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে। তাঁর জন্মদিনে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও