
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: বাংলা গানের ভুবনে এক অনন্য নাম লাকী আখন্দ। আধুনিক বাংলা সংগীতের সুর, সুরের বিন্যাস, আর আবেগময় পরিবেশনায় তিনি যে ধারা তৈরি করেছিলেন, তা আজও সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে গভীরভাবে অনুরণিত হয়। ২১ এপ্রিল তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী—এই দিনে তাঁকে স্মরণ করা মানে বাংলাদেশের সংগীতের এক সোনালি অধ্যায়কে নতুন করে আবিষ্কার করা।
জীবন ও সংগীতের সূচনা:
১৯৫৬ সালের ৭ জুন ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন লাকী আখন্দ। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি তাঁর আকর্ষণ তৈরি হয়; মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই বাবার কাছে সংগীত শিক্ষা শুরু করেন। শৈশবে টেলিভিশন ও রেডিওর শিশু-কিশোর অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি দ্রুত পরিচিতি লাভ করেন।
কৈশোরেই তাঁর প্রতিভার স্বীকৃতি আসে—১৪ বছর বয়সে তিনি এইচএমভি পাকিস্তানের সংগীতশিল্পী হিসেবে যুক্ত হন এবং ১৬ বছর বয়সে এইচএমভি ইন্ডিয়ার সঙ্গেও কাজ করেন।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যুক্ত হয়ে দেশপ্রেমের গান পরিবেশন করেন, যা মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করেছিল।
সংগীতজীবন ও সৃষ্টিশীলতা:
লাকী আখন্দের সংগীতজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক আসে ১৯৮৪ সালে, যখন তাঁর প্রথম একক অ্যালবাম “Lucky Akhand” প্রকাশিত হয়। এই অ্যালবামের গানগুলো—“এই নীল মনিহার” “আমায় ডেকো না” “আগে যদি জানতাম” “মামোনিয়া”
বাংলা আধুনিক গানের ক্লাসিক হিসেবে বিবেচিত।
তিনি শুধু নিজে গান গেয়েছেন তা নয়, বরং অসংখ্য জনপ্রিয় গান সুর করেছেন—
“আবার এলো যে সন্ধ্যা”, “কে বাঁশি বাজায় রে”, “স্বাধীনতা তোমাকে নিয়ে”, “হঠাৎ করে বাংলাদেশ”—এসব গান আজও সমান জনপ্রিয়।
তার সংগীতে ছিল পাশ্চাত্য সুর, ফোক এবং আধুনিকতার এক অনন্য মিশ্রণ, যা তাকে সমকালীনদের থেকে আলাদা করেছে।
ব্যক্তিগত জীবনের প্রভাব:
লাকী আখন্দের সংগীতজীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল তাঁর ছোট ভাই হ্যাপি আখন্দ-এর মৃত্যু (১৯৮৭)। এই ঘটনার পর তিনি দীর্ঘ সময় সংগীত থেকে দূরে সরে যান। পরে ১৯৯৮ সালে “পরিচয় কবে হবে” ও “বিতৃষ্ণ জীবনে আমার” অ্যালবামের মাধ্যমে আবার ফিরে আসেন।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার:
দীর্ঘদিন ফুসফুসের ক্যান্সারে ভোগার পর ২০১৭ সালের ২১ এপ্রিল ঢাকায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ৬১ বছর।
তার মৃত্যু বাংলা সংগীত জগতে এক অপূরণীয় শূন্যতা সৃষ্টি করে। তবে তাঁর সৃষ্ট গান, সুর ও সংগীতধারা আজও নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের প্রেরণা জোগায়।
মূল্যায়ন:
লাকী আখন্দ কেবল একজন গায়ক বা সুরকার ছিলেন না—তিনি ছিলেন এক যুগের নির্মাতা। তাঁর গানগুলোতে যেমন প্রেম, বেদনা, দেশপ্রেম ও জীবনবোধের গভীরতা পাওয়া যায়, তেমনি সুরের নতুনত্বও লক্ষ করা যায়।
বাংলাদেশের আধুনিক গানের ইতিহাসে তাঁর নাম উচ্চারণ করা মানেই এক আবেগঘন সুরের জগতে প্রবেশ করা—যেখানে সময় থেমে যায়, কিন্তু সুর বেঁচে থাকে চিরকাল।
শেষ কথা:
মৃত্যুবার্ষিকীতে লাকী আখন্দকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন শিল্পীকে নয়, বরং বাংলা সংগীতের এক স্বর্ণালি উত্তরাধিকারকে সম্মান জানানো। তাঁর সৃষ্টির মধ্যেই তিনি অমর।