
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি – বিনোদন সাংবাদিক::
বাংলাদেশের প্রখ্যাত লেখক, তৎকালীন পূর্ববঙ্গের তথা বাংলাদেশের মুক্তচিন্তার প্রবাদ পুরুষ কাজী মোতাহের হোসেন এর ৪৩তম মৃত্যুবার্ষিকী ৯ই অক্টোবর। তিনি একাধারে একজন সফল শিক্ষাবিদ, পরিসংখ্যানবিদ, অনুবাদক, সাহিত্যিক, সঙ্গীতজ্ঞ ও ক্রীড়াবিদ ছিলেন।
তিনি ১৮৯৭ সালের ৩০ জুলাই কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী থানার লক্ষ্মীপুর গ্রামে তাঁর নানার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক বাড়ি রাজবাড়ী জেলার পাংশা থানার বাগমারা গ্রামে। তাঁর পিতার নাম কাজী গওহর উদ্দিন আহমেদ ও মাতার নাম তসিরুন্নেসা। বিশিষ্ট লেখক, গায়ক ও জনপ্রিয় গোয়েন্দা কাহিনী মাসুদ রানা সিরিজের স্রষ্টা কাজী আনোয়ার হোসেন তাঁর পুত্র ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সনজিদা খাতুন তাঁর কন্যা।
তিনি ১৯১৫ সালে কুষ্টিয়া মুসলিম হাই স্কুল থেকে মেট্রিক ও ১৯১৭ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন। তিনি ১৯১৯ সালে তৎকালীন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ঢাকা কলেজ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে অনার্স ও ১৯২১ সালে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ১৯৩৮ সালে ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট থেকে পরিসংখ্যান বিষয়ে ডিপ্লোমা ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে এম.এ ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৫১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিসংখ্যানে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনিই পূর্ববঙ্গ তথা বাংলাদেশের প্রথম স্বীকৃত পরিসংখ্যানবিদ।
কর্মজীবনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯২১-১৯৪৭ সাল পর্যন্ত পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে ও ১৯৪৯-১৯৬১ সাল পর্যন্ত পরিসংখ্যান বিভাগে শিক্ষকতা করেন।
তিনি ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সমর্থক ছিলেন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার লক্ষ্যে তিনি বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তিনি তৎকালীন জনপ্রিয় শিখা পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। তিনি বিশিষ্ট সাহিত্যিক কাজী আবদুল ওদুদ, সৈয়দ আবুল হোসেন ও আবুল ফজল এর সাথে মুসলিম সাহিত্য সমাজ গড়ে তোলেন। তিনি বাংলা একাডেমীর একজন প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।
বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে তাঁর খুবই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।
তিনি বিজ্ঞান, সাহিত্য ও সংস্কৃতির উপর অনেক বই ও প্রবন্ধ রচনা করেন। তাঁর লেখা বইগুলোর মধ্যে সঞ্চায়ন (১৯৩৭), নজরুল কাব্য পরিচিতি (১৯৫৫), সেই পথ লক্ষ্য করে (১৯৫৮), সিম্পোজিয়াম (১৯৬৫), গণিত শাস্ত্রের ইতিহাস (১৯৭০), আলোক বিজ্ঞান (১৯৭৪), নির্বাচিত প্রবন্ধ (১৯৭৬), প্লেটো সিম্পোজিয়াম (অনুবাদ, ১৯৬৫) অন্যতম।
তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন ও স্বীকৃতিপ্রাপ্ত একজন দাবাড়ু ছিলেন। তিনি ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দাবাড়ু হিসেবে ১৯২৯-১৯৬০ সাল পর্যন্ত অবিভক্ত বাংলা ও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের একক চ্যাম্পিয়ান ছিলেন। তাঁকে বাংলাদেশের দাবা খেলার পথিকৃৎ হিসেবে সম্মান করা হয়। দাবা খেলায় তাঁর অবদানের কথা স্মরণ করে বাংলাদেশ দাবা ফেডারেশনের উদ্যোগে কাজী মোতাহের হোসেন স্মৃতি আন্তর্জাতিক দাবা প্রতিযোগিতা নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হয়।
তিনি তাঁর কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৬০ সালে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক সিতারা-ই-ইমতিয়াজ উপাধি, ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ডি.এস.সি ডিগ্রি, ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে সম্মান অর্জন করেন। তিনি বাংলা একাডেমি পুরষ্কার (১৯৬৬) ও স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৭৯) অর্জন করেন।
এই মহান ব্যক্তিত্ব ১৯৮১ সালের ৯ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন।
তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলী।
