
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে যে ক’জন অভিনেত্রী দীর্ঘ সময় ধরে দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম রোজিনা।
জন্ম ও পরিচয়: রোজিনার প্রকৃত নাম রওশন আরা রোজিনা। তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের একজন প্রখ্যাত অভিনেত্রী। যদিও তাঁর জন্মতারিখ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য উন্মুক্ত সূত্রে সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না, তবে তিনি ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে চলচ্চিত্রে আত্মপ্রকাশ করেন এবং দ্রুতই জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
চলচ্চিত্রে আগমন ও উত্থান: রোজিনা চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করেন ১৯৭০-এর দশকে। শুরুতে প্রতিযোগিতামূলক চলচ্চিত্র জগতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা কঠিন হলেও, ধীরে ধীরে তিনি প্রধান নায়িকা হিসেবে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন।
১৯৮০-এর দশকে তিনি হয়ে ওঠেন বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম ব্যস্ত ও জনপ্রিয় নায়িকা। তাঁর অভিনয়ে ছিল স্বাভাবিকতা, আবেগ ও গ্রামীণ-নগর জীবনের মিশ্র বাস্তবতা—যা দর্শকদের সঙ্গে সহজেই সংযোগ স্থাপন করত।
উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র ও সাফল্য: রোজিনা প্রায় ৩০০টিরও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন—যা তাঁর দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ক্যারিয়ারের প্রমাণ।
তাঁর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে—কসাই, মানসী, সুখের সংসার, মাটির মানুষ, রাজ সিংহাসন, দুনিয়া, রানী চোরের রাজা প্রভৃতি৷
তিনি ভারতীয় জনপ্রিয় অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তী-এর সঙ্গেও খ্যাতিমান নির্মাতা শক্তি সামন্ত পরিচালিত অবিচার (১৯৮৫) ছবিতে অভিনয় করেছেন, যা তাঁর আন্তর্জাতিক পরিসরে কাজের পরিচায়ক।
পুরস্কার ও সম্মাননা: রোজিনার অভিনয় প্রতিভা বিভিন্ন সময় স্বীকৃতি পেয়েছে—
বাংলাদেশ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রী) — কসাই চলচ্চিত্রের জন্য। আজীবন সম্মাননা (Lifetime Achievement Award) — ২০২৩ সালে প্রদান করা হয়। এই পুরস্কারগুলো তাঁর দীর্ঘ অভিনয়জীবনের স্বীকৃতি বহন করে।
অভিনয়ের বৈশিষ্ট্য ও প্রভাব: রোজিনার অভিনয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল—গ্রামীণ নারীর বাস্তবচিত্র তুলে ধরা
আবেগঘন চরিত্রে স্বতঃস্ফূর্ততা, বাণিজ্যিক ও সামাজিক দুই ধারার চলচ্চিত্রেই দক্ষতা।
তিনি এমন এক সময়ে কাজ করেছেন, যখন বাংলা চলচ্চিত্র তার স্বর্ণালী ও বাণিজ্যিক উভয় ধারার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল। তাঁর অভিনয় সেই সময়ের দর্শকদের রুচি ও সমাজবাস্তবতার প্রতিফলন।
পরবর্তী জীবন ও নতুন পরিচয়: দীর্ঘদিন অভিনয়ের পর রোজিনা চলচ্চিত্র নির্মাণের দিকেও আগ্রহী হন। ২০২৩ সালে তিনি “ফিরে দেখা” চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
এছাড়া ব্যক্তিগত উদ্যোগে সমাজসেবামূলক কাজেও তিনি যুক্ত আছেন—যেমন নিজ এলাকায় মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
শেষ কথা: নায়িকা রোজিনা শুধু একজন অভিনেত্রী নন, তিনি এক সময়ের চলচ্চিত্র-সংস্কৃতির প্রতীক। তাঁর অভিনয়, সংগ্রাম ও সাফল্য বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।
জন্মদিনে তাঁর প্রতি রইল শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং সুস্থ দীর্ঘ জীবনের শুভকামনা।