
ফাহিম শাহরিয়ার রুমি: বাংলাদেশের মঞ্চনাট্য অঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, আতাউর রহমান আর নেই। তাঁর মৃত্যুতে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
মৃত্যু ও শেষ সময়:
প্রবীণ এই নাট্যব্যক্তিত্ব ২০২৬ সালের ১১ মে গভীর রাতে (প্রায় ১১:৫০টা–১২টা) রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, কয়েকদিন আগে নিজ বাসায় পড়ে গিয়ে তিনি গুরুতর আহত হন। প্রথমে গুলশানের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ধানমন্ডির একটি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল।
শ্রদ্ধা ও শেষ বিদায়:
নাট্যজগতের এই বরেণ্য ব্যক্তিত্বকে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য তাঁর মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেওয়া হয়, যেখানে সর্বস্তরের মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে জানাজা শেষে বনানী কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
জন্ম, শিক্ষা ও নাট্যজীবন:
১৯৪১ সালের ১৮ জুন নোয়াখালীতে জন্মগ্রহণ করেন আতাউর রহমান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকা বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করলেও তাঁর আসল পরিচয় গড়ে ওঠে নাট্যাঙ্গনে।
তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী নাট্য আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তিনি অভিনেতা, নাট্যকার, নির্দেশক ও সংগঠক হিসেবে মঞ্চনাট্যে অসামান্য অবদান রাখেন।
‘মঞ্চশরথী’ নামে পরিচিত এই শিল্পী নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়সহ বিভিন্ন নাট্য সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের নেতৃত্বেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
নাট্যকর্ম ও অবদান:
আতাউর রহমান দেশি-বিদেশি বহু গুরুত্বপূর্ণ নাটক মঞ্চস্থ করেন। তাঁর নির্দেশনায় মঞ্চে উঠে এসেছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রক্তকরবী, স্যামুয়েল বেকেটের Waiting for Godot, বের্টোল্ট ব্রেখটের Galileoসহ বিশ্বনন্দিত নাটক।
তাঁর কাজের বৈশিষ্ট্য ছিল নাট্যচিন্তার গভীরতা, সমাজ-বাস্তবতার প্রতিফলন এবং অভিনয়ের শৈল্পিক পরিমিতি—যা বাংলাদেশের মঞ্চনাট্যকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচিত করতে সহায়তা করেছে।
পুরস্কার ও স্বীকৃতি:
বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কারসহ বহু সম্মাননায় ভূষিত হন।
সাংস্কৃতিক অঙ্গনের শোক:
তাঁর মৃত্যুতে নাট্যকর্মী, অভিনেতা, লেখক এবং সংস্কৃতিমনস্ক মানুষ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তাঁরা মনে করেন, আতাউর রহমানের মৃত্যু বাংলাদেশের মঞ্চনাট্যের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।
শেষ কথা:
আতাউর রহমান শুধু একজন নাট্যব্যক্তিত্বই নন, তিনি ছিলেন সেই মানুষদের একজন যাদের হাতে আমাদের মঞ্চনাট্যের ভিত্তিটা ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছিল—যেখানে শিল্প, সমাজ ও মানুষের গল্প মিশে গেছে মঞ্চের আলো-অন্ধকারে। তাঁর প্রয়াণে একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলেও তাঁর সৃষ্টি ও দর্শন বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় চিরকাল প্রেরণা জোগাবে।